বাংলাদেশের শিক্ষা - ছোট
বাংলাদেশের শিক্ষা - ছোট


মাহফুজুর রহমান মানিক: প্রবাদে আছে অসির চেয়ে মসির শক্তি বেশি। বাস্তব বলে অন্য কথা। অস্ত্রের চেয়ে শক্তিশালী আর কী হতে পারে। যার হাতে অস্ত্র সেই ক্ষমতাবান। অস্ত্রের কাছে সবাই অসহায়। ছাত্রের হাতে অস্ত্র থাকলে শিক্ষক অসহায়। খবরটা শনিবারের সমকালের। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ছাত্রলীগ নেতা পরীক্ষার হলে গেছেন অস্ত্র নিয়ে। অস্ত্রের দাপটে তিনি তার নির্দিষ্ট আসনে বসেননি। দায়িত্বরত শিক্ষক তাকে নিজ আসনে বসতে বললেও শিক্ষকের কথা শোনেননি। উল্টো এ নেতা ক্ষিপ্ত হয়ে তার অস্ত্র দেখিয়ে হুমকি দিয়ে শিক্ষককে বলেছেন, ‘আমি যেভাবে পরীক্ষা দিতে চাই সেভাবেই পরীক্ষা দেব, আমাকে বাধা দিলে আমি পরীক্ষা বন্ধ করে দেব।’

একজন ছাত্রনেতার এত ক্ষমতা! পরীক্ষা বন্ধের ক্ষমতা রাখেন তিনি। তার কাছে দায়িত্বরত শিক্ষক যে কত অসহায় সেটা বোঝা গেল এই প্রতিবেদন থেকেই। ওই শিক্ষক এ ঘটনায় কোনো অভিযোগ করেননি। এমনকি ১৪ তারিখ ঘটনাটি ঘটলেও তার প্রতিকার হয়েছে বলে কোনো সংবাদমাধ্যম খবর দেয়নি।

এ রকম অসহায়ত্বের খবর সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই আসে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন তাদের ইচ্ছেমতো সবই করে। প্রতিপক্ষ ছাত্র সংগঠনের ওপর হামলা, হল দখল, চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজি, শিক্ষকদের অপমানসহ এ রকম নানা অপকর্ম তারা করেই যান। কিন্তু এখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ঘটনা ঘটল তার ব্যাখ্যা কীভাবে দেওয়া যেতে পারে। একজন শিক্ষার্থী হিসেবে তার প্রধান দায়িত্ব নিয়মিত ক্লাস করা, পরীক্ষায় অংশ নেওয়া। এসব ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যে সিদ্ধান্ত দেবে সেটা মানতে প্রত্যেক শিক্ষার্থী বাধ্য। এটা তো স্বতঃসিদ্ধ যে, প্রত্যেক শিক্ষার্থী পরীক্ষার হলে প্রবেশ করবে প্রবেশপত্র, কলম ও পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে। সেখানে অস্ত্র নিয়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ। অথচ এ নেতা অস্ত্র নিয়ে গেছেন। যেখানে পরীক্ষার হলে অনেক সময় সায়েন্টিফিক ক্যালকুলেটর নিয়েও প্রবেশ করা যায় না সেখানে তিনি অস্ত্র নিয়ে ঢুকলেন কীভাবে? এমনিতেই বড় অপরাধের কাজ করেছেন তিনি। এর ওপর তার নির্দিষ্ট আসনে বসেননি। সেটা আরেক অপরাধ। এর চেয়েও বড় অপরাধ হলো, দায়িত্বরত শিক্ষক তাকে তার আসনে বসতে বলার পরও আদেশ মানেননি। আর তিনি যে চরম অপরাধটি করেছেন তাহলো, ওই শিক্ষককে হুমকি দিয়েছেন। আর পরীক্ষা বন্ধ করে দেওয়ার যে হুমকি দিয়েছেন সেটার বর্ণনা বলাই বাহুল্য।

আরও অবাক করার বিষয় হলো, দায়িত্বরত ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে হুমকি দেওয়ার পরও ছাত্রনেতার কিছু হয়নি। শিক্ষকও কোথাও অভিযোগ করেননি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, অসহায় শিক্ষকের চেয়েও ক্ষমতাবান ছাত্রনেতা। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগবে তার ক্ষমতার উৎস কি? ঘটনাদৃষ্টে একটা উৎস হয়তো আমরা দেখছি তার অস্ত্র। কিন্তু এটাই কি চূড়ান্ত? কোন সাহসে এ নেতা পরীক্ষা বন্ধ করে দেওয়ার মতো হুমকি দিতে পারেন। তার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বড় কারও যে যোগসাজশ রয়েছে সহজেই তা বলা যায়। আর একটা বিশ্ববিদ্যালয় দলীয়করণের কোন পর্যায়ে গেলে দলীয় ছাত্রসংগঠনের নেতারা শিক্ষকদের সঙ্গে এ রকম ব্যবহার করতে পারেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর ছাত্র সংগঠন কতটা কলুষিত হলে একজন ছাত্রনেতা এ রকম কাজ করতে পারেন তারও ব্যাখ্যার দরকার পড়ে না। এভাবে যতদিন ছাত্রনেতাদের হাতে কলমের পরিবর্তে অস্ত্র থাকবে; পরীক্ষার হলে শিক্ষা সামগ্রীর পরিবর্তে অস্ত্র নিয়ে ঢুকবে; প্রশাসনের নিয়মকে নিজেদের সুবিধায় ভেঙে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করবে; পড়াশোনা না করে অন্য উপায়ে পাস করতে চাইবে; ততদিন পর্যন্ত এদের দিয়ে জাতি ভালো কিছু আশা করতে পারে না।

কলমের চেয়ে অস্ত্র শক্তিশালী হয়ে উঠলে সেটা ভয়ঙ্কর হতে বাধ্য। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা এভাবে চলতে থাকলে আর এগুলোকে প্রশ্রয় দিলে সেটা কোনো দলের জন্যই ভালো ফল এনে দেবে না।

মাহফুজুর রহমান মানিক: শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Previous articleবিদ্যালয়ে ভর্তি-কোটা: অপ্রয়োজনীয় ভাবনার প্রতিক্রিয়া
পরবর্তী লেখাউচ্চশিক্ষা এবং সামাজিক পরিবর্তন: ব্যবচ্ছেদে বাণিজ্যিকরণ
আকলিমা শরমিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে বিএড (অনার্স) ও এমএড ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে। পেশাগত জীবন শুরু করেন ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে। এরপর কাজ করেছেন অঙ্কুর আইসিটি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন, ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ এবং ব্রিটিশ কাউন্সিলে। বর্তমানে ম্যানেজার-আইসিটি ইন এডুকেশন হিসেবে কর্মরত রয়েছেন আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেনে। সরাসরি শিক্ষকদের সঙ্গেও যেমন কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে, তেমনি কাজ করেছেন শিক্ষার্থীদের নিয়েও। ইচ্ছা শিক্ষা নিয়েই কাজ করার। শিক্ষাকে একটি স্বতন্ত্র বিজ্ঞান বা discipline হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য কাজ করে যেতে চান সবসময়। পেশাগত কাজের পাশাপাশি আকলিমা শরমিন 'বাংলাদেশের শিক্ষা' ওয়েবসাইটের সহযোগী সম্পাদক হিসেবেও কর্মরত রয়েছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here