শাস্তি

আকতার বানু


সম্প্রতি শিক্ষকদের জন্য নতুন ১০টি আইন প্রকাশ করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এটি নিঃসন্দেহে সরকারের একটি ভালো পদক্ষেপ। এতে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ের সাথে প্রাইভেট টিউশন ও কোচিং বন্ধে সরকারের যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলা আছে। এ-সংক্রান্ত আইনের ধারা লঙ্ঘন করলে অভিযুক্ত ব্যক্তি অনধিক দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা ছয় মাসের জেল বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

বাংলাদেশের ১৯৬০ সালের চাকরীবিধি অনুযায়ী বিদ্যালয় শিক্ষক, ১৯৭৯ সালের চাকরীবিধি অনুযায়ী উচ্চমাধ্যমিক কলেজশিক্ষক, ১৯৯৪ সালের চাকরীবিধি অনুযায়ী ডিগ্রি অনার্স কলেজের শিক্ষকরা প্রাইভেট পড়াতে পারবেন না। অন্য চাকরিও করতে পারবেন না। কিন্তু এসব বিধির বাস্তবায়ন নেই। শিক্ষকরাও তা মানছেন না। ফলে শিক্ষকদের অনৈতিক কোচিং ব্যবসা বাংলাদেশের মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থাকে বিকলাঙ্গ করে দিচ্ছে দিন দিন।

বর্তমানে বাংলাদেশে মূলত শিক্ষকদের সীমাহীন লোভ, পিএসসি-জেএসসি পরীক্ষা, সৃজনশীল পদ্ধতি চালু, বিভিন্ন ভর্তি পরীক্ষা ইত্যাদির কারণে কোচিং ব্যবসার লাগামহীন প্রসার ঘটেছে গোটা দেশে। শহর তো বটেই, গ্রামের বিদ্যালয়গুলোতেও প্রাইভেট ব্যবসা জমজমাট। শিক্ষকরূপী এসব কোচিং ব্যবসায়ীর হাতে জিম্মি সব শ্রেণি-পেশার শিক্ষার্থী-অভিভাবক। আগে কোনো শিক্ষার্থী প্রাইভেট না পড়লে শিক্ষকরা তাকে বাধ্য করত না। এখন শিক্ষকরা প্রাইভেটে শিক্ষার্থী আনার জন্য নম্বর কম দেয়া, শিক্ষার্থীদের মারা, ইচ্ছে করে কঠিন প্রশ্ন করা, যারা পড়ে তাদেরকে পরীক্ষার আগে প্রশ্ন আউট করে দেয়া, তাদেরকে নম্বর বেশি দেয়া, যারা পড়ে না তাদেরকে কম নম্বর দেয়া, অভিভাবকদেরকে নানাভাবে চাপ দেয়া ইত্যাদি নানা কূটকৌশল অবলম্বন করেন।

কোচিং বাণিজ্য ভয়াবহভাবে বেড়ে যাওয়ায় এসব লোভী শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অভিভাবক ঐক্য ফোরাম আদালতে ২০১১ সালের শেষের দিকে একটি রিট করেন। এর ফলে শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্যের বিরুদ্ধে ২০১২ সালে ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং-বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা ২০১২’ প্রণয়ন করেছে বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ নীতিমালা অনুসারে কোনো শিক্ষক তাঁর নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়াতে পারবেন না। প্রতিষ্ঠান-প্রধানের অনুমতি নিয়ে অন্য বিদ্যালয়ের একসাথে সর্বোচ্চ দশ জন শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়াতে পারবেন। অভিভাবকদের অনুরোধে পিছিয়ে-পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিদ্যালয়ের ভিতরেই অল্প ফিতে প্রতিষ্ঠান-প্রধানের অনুমতিক্রমে অতিরিক্ত ক্লাস করানো যাবে।

এই নীতিমালা না মানলে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে নানা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কথা বলা আছে। যেমন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিও স্থগিত বা বাতিল, সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে সাময়িক বা স্থায়ী বরখাস্ত, পেশাগত অসদাচরণের কারণে শৃঙ্খলা আপীল বিধি অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি ও পাঠদান অনুমতি বাতিল ইত্যাদি। কিন্তু এসব আইন বা নীতিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকরা ক্লাসে দায়সারাভাবে পড়িয়ে ছুটছেন প্রাইভেট পড়াতে। কখনও নিজ বাসায় বা বিভিন্ন কোচিং সেন্টারে। শিক্ষার্থীদের গাদাগাদি করে বসিয়ে ব্যাচের পর ব্যাচ পড়াচ্ছেন। এমনকি, বিদ্যালয়ের বা কলেজের ক্লাসে ঠিকমত না পড়িয়ে বিদ্যালয় ছুটির পর কোচিং ক্লাসে বেশি টাকা নিয়ে ঠিকই যত্ন করে পড়াচ্ছেন ওই বিদ্যালয় বা কলেজেই। শিক্ষার্থীরাও ক্লাসে হাজিরা দিয়েই ছুটতে বাধ্য হচ্ছে এসব শিক্ষকদের কাছে। প্রচুর ভালো নামকরা শিক্ষক আছেন যারা ক্লাসে ভালো না পড়ালেও কোচিং-এ খুবই ভালো পড়ান। শিক্ষকরা ক্লাসে ঠিকমত পড়িয়ে দিলেই শিক্ষার্থীদের কোচিং-এর পিছনে ছুটতে হতো না। অভিভাবকদেরও অর্থ, সময় ও শ্রমের অপচয়ও হতো না। এ বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নতুন আইন কতটুকু কাজে আসবে তা বোঝা যাবে আইনগুলোর কঠোর প্রয়োগের ওপর। তবে এ বিষয়ে সরকারের কঠোর ভূমিকা খুবই প্রয়োজন।

তাছাড়া এ নতুন আইনে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তির বিষয়ে বলা আছে যে, শিক্ষার্থীদের মানসিক বা শারীরিক শাস্তি দেয়া যাবে না। কোনো শিক্ষক এ আইন লঙ্ঘন করলে অনধিক ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা তিন মাসের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এটিও খুবই প্রয়োজনীয় একটি সিদ্ধান্ত। কেননা, বাংলাদেশে যেকোন শিক্ষার্থীকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন না করার আদেশ-সম্বলিত হাইকোর্টের নির্দেশনা আছে যা না মানলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবার বিধান ছিল। শতকরা ৪০ ভাগ বিদ্যালয়েই কোনো না কোনো শিক্ষার্থী শারীরিক বা মানসিকভাবে নির্যাতিত হয়। এ বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের এ আদেশ শিক্ষা মন্ত্রণালয় বাংলাদেশের ৬৪ হাজার বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের কক্ষে টানিয়ে রাখার জন্য পরিপত্র জারি করেছিল। আদেশটি শিক্ষকরা ঠিকমতো মানছেন কিনা তা তদারকের ব্যবস্থাও ছিল।

তারপরেও মাঝেমাঝেই মিডিয়াতে শিক্ষার্থী নির্যাতনের ভয়ংকর, বীভৎস ছবি ও খবর দেখা যায়। এসব খবরে যেকোন বিবেকবান মানুষের খারাপ লাগার কথা। সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও এ বর্বরতা বন্ধ হচ্ছিল না। বাংলাদেশের প্রায় সব বিদ্যালয় ও মাদ্রাসায় রোজ কোনো না কোনো কোমলমতি শিক্ষার্থীর উপর কিছু শিক্ষক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করেই চলেছেন। এতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মনের অনুভূতি কেমন হয়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এসব নির্যাতন যে পরিমাণে ঘটে, তার খুব সামান্যই মিডিয়াতে আসে। আর এসব অপরাধী শিক্ষকদের শাস্তি হবার ঘটনা তো আরোই বিরল। নতুন এ আইনের কঠোর প্রয়োগ হলে শিক্ষার্থী নির্যাতনের মতো অমানবিক ঘটনা হ্রাস পাবে আশা করা যায়।

শিক্ষকদের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নতুন ১০টি আইন অনুসারে যেসব ক্ষেত্রে শিক্ষক এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দণ্ড ও জরিমানা গুনতে হবে সেগুলো হলো:

১. ইংরেজি মাধ্যমসহ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের বেতন ও অন্যান্য ফি সরকারের অনুমোদন ছাড়া নির্ধারণ করা যাবে না। আইন লঙ্ঘন করলে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা এক বছরের কারাদণ্ড বা উভয়দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে আইনে। ইংরেজি মাধ্যমের প্রতিষ্ঠান হলেও বাংলা ও বাংলাদেশ স্টাডিজ বিষয় পড়ানো হবে বাধ্যতামূলক।

২. আইনানুযায়ী প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিকে কিন্ডারগার্টেন, ইংরেজি মাধ্যম ও এবতেদায়ী মাদ্রাসাসহ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের কাছে বাধ্যতামূলকভাবে নিবন্ধন করতে হবে। নিবন্ধনের এ বিধান লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান বন্ধসহ দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান জরিমানা বা ছয় মাসের কারাদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

৩. মাধ্যমিক স্তরে সাধারণ, মাদ্রাসা, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও ইংরেজি মাধ্যম বা বিদেশি কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশি কোনো শাখাসহ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বাধ্যতামূলকভাবে নিবন্ধন নিতে হবে। এ নিয়ম লঙ্ঘন করলেও সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান বন্ধসহ দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকা জরিমানা বা ছয় মাসের কারাদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে।

৪. জাতীয় পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি প্রণয়ন করবে। এনসিটিবির অনুমোদন ছাড়া এসব স্তরে শিক্ষাক্রমে অতিরিক্ত কোনো বিষয় বা বই অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। কেউ অতিরিক্ত বই অন্তর্ভুক্ত করলে জরিমানা ও ছয় মাসের কারাদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

৫. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধ ও বাঙালি সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতির পরিপন্থী ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে এমন কার্যক্রম অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এজন্যও জরিমানা ও ছয় মাসের কারাদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

৬. সরকার প্রাইভেট টিউশন ও কোচিং বন্ধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। এ ধারা লঙ্ঘন করলে তিনি অনধিক দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা ছয় মাসের জেল বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

৭. শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তির বিষয়ে বলা আছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবস্থানকালীন মানসিক বা শারীরিক শাস্তি দেয়া যাবে না। এটি লঙ্ঘন করলে শিক্ষক অনধিক ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা তিন মাসের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

৮. প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে নির্ধারিত পাঠ্যবই না পড়িয়ে বাইরের বই পড়ালে দুই লাখ টাকা জরিমানা বা ছয় মাসের জেল বা উভয় দণ্ড রাখা হয়েছে খসড়ায়।

৯. কলেজ পর্যায়ে প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও পরিচালনার জন্য অনুমতি নিতে হবে। অন্যথায় ১০ লাখ টাকা জরিমানা বা পাঁচ বছর জেল বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

১০. অনুমতি ছাড়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় চালালে বা শাখা ক্যাম্পাস, স্টাডি সেন্টার বা টিউটোরিয়াল কেন্দ্র স্থাপন করলে পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড ভোগ করতে হবে।

প্রতিটি আইনই শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে ভালো ভূমিকা রাখতে পারে। এখন শুধু এগুলোর কঠোর, দ্রুত ও কার্যকর প্রয়োগ হবার অপেক্ষা। আমরা আশাবাদী হতে চাই।

Previous articleশিক্ষক যখন যৌননির্যাতনকারী
ড. আকতার বানু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইআর)-এর একজন সহযোগী অধ্যাপক। তিনি এসএসসিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল থেকে রাজশাহী বোর্ডে মানবিক বিভাগ থেকে মেয়েদের মধ্যে প্রথম ও সম্মিলিত মেধা তালিকায় অষ্টম স্থান এবং এইচএসসিতে রাজশাহী কলেজ থেকে রাজশাহী বোর্ডের মানবিক বিভাগ থেকে মেয়েদের মধ্যে প্রথম ও সম্মিলিত মেধা তালিকায় তৃতীয় স্থান অধিকার করেন। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোবিজ্ঞানে অনার্স ও মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানে পিএইচডি করেছেন। তিনি বর্তমানে শিক্ষা মনোবিজ্ঞানে পাঠদান, লেখালেখি, নানা গবেষণামূলক কাজ ও কাউন্সেলিং করছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here