মাছুম বিল্লাহ
মাছুম বিল্লাহ


মাছুম বিল্লাহ: যখনই নতুন কারিকুলামে টেকস্ট বই প্রকাশ করা হয় তখনই বইয়ের শেষে একটি স্যাম্পল প্রশ্ন দেওয়া হয় যাতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ শিক্ষার সাথে জড়িত সবাই বিষয়টি ভালোভাবে অনুধাবন করতে পারে। শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে পারে। কিন্তু ২০১৩ সালে কারিকুলাম পরিবর্তন করা হলো, বই ছাপা হলো কিন্তু কোনো ধরনের স্যাম্পল প্রশ্ন দেওয়া হলো না। ভাল কথা। টেকস্ট বইয়ে ছাড়া ছাড়া অর্ধসমাপ্ত কিছু কিছু প্রশ্ন প্রায় প্রতিটি চ্যাপ্টার/ইউনিটে আছে। শিক্ষক, শিক্ষার্থীরা ওভাবেই পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে থাকতো অর্থাৎ ওগুলোকে ধরে নিতো যে এ ধরনের প্রশ্নই পরীক্ষায় থাকবে বা এধরনের প্রশ্নের মাধ্যমেই শিক্ষার্থীদের ইংরেজি জ্ঞান যাচাই করা হবে। কিন্তু জানুয়ারি মাসে বই বিতরণ করে মার্চের শেষের দিকে একটি প্রশ্নপত্র ছাড়া হলো ইন্টারনেটে। বাংলাদেশে ১২ শতাংশেরও কম লোক কম্পিউটার ব্যবহার করে, অতএব ইন্টারনেটে মডেল প্রশ্ন ছাড়া হলে সব ধরনের শিক্ষার্থীর কাছে কিভাবে পৌঁছাবে? এসসিটিবি ধরেই নিয়েছে যে, তাদের দায়িত্ব শেষ, বাকিটা প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান বা প্রকাশকরা করবে। আবার সভা সেমিনারে বলা হচ্ছে যে, প্রাইভেট প্রকাশকরা কোনো ধরনের নোট বা গাইড বই যাতে প্রকাশ করতে না পারে সেজনই এই ব্যবস্থা। বিপরীতধর্মী কথা মনে হচ্ছে।

ধরা যাক, বিভিন্ন প্রকাশক বা শিক্ষক সমিতির সহায়তায় মোটামুটি সবাই জেনে গেল যে, এধরনের প্রশ্নপত্রই প্রণয়ন করা হবে পাবলিক পরীক্ষায়। সবাই সেভাবে প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করলো, কিছুদিন পর আবার প্রশ্নের ধরন পরিবর্তন করা হলো। সবাই কনফিউজড। আবার সংশ্লিষ্ট সবাই ঝেড়েঝুড়ে নতুন প্রশ্নপত্রের ওপর প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করল। আবার পরিবর্তন করা হলো। এভাবে পাঁচবার প্রশ্নপত্রের ধরনে পরিবর্তন আনা হলো। সর্বশেষ যেটি হয়েছে তাতে বলা হয়েছে টেকস্ট বই থেকে কোনো ধরনের প্রশ্নপত্র সেট করা হবে না। এ কেমন সিদ্ধান্ত? টেকস্ট বই থেকে প্রশ্নপত্র সেট করা না হলে শিক্ষার্থীরা টেকস্ট বই তো ছুঁবেই না। একটা অংশ তো টেকস্ট বই থেকে করা যায়, বাকিটা বাইরে থেকে করা যেত।

পূর্ববর্তী কারিকুলামে বলা হয়েছিল যে, টেকস্ট বইয়ের অনুরূপ একটি প্যাসেজ প্রশ্নপত্র প্রণেতারা তৈরি করবেন। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। হুবহু বইয়ের প্যাসেজই তুলে দেওয়া হতো। তারপরও একটি যুক্তি ছিল যে, ওই প্যাসেজের ওপর নম্বর ছিল ৪০। দুই পেপারের বাকি ১৬০ নম্বর থাকতো আনসিন। কিন্তু এবার কী করা হলো?

১৯৯৭ সালের কারিকুলাম অনুযায়ী যে ইংরেজি বই ছাপা হয়েছিলো সেখান থেকে হুবহু প্যাসেজ তুলে দেয়া হতো স্কুল এবং পাবলিক উভয় পরীক্ষাতেই। তারপরেও শিক্ষার্থীরা টেকস্ট বইয়ে হাত দিত না, নোট এবং গাইড বই নিয়েই ব্যস্ত থাকত। এবার আশা করেছিলাম যে, টেকস্ট বই শিক্ষার্থীরা যাতে পড়ে সে ধরনের একটি ব্যবস্থা থাকবে। কিন্তু দেখা গেল এনসিটিবি এবার আরেক ধাপ উপরে উঠে গেছে। টেকস্ট বই থেকে কোনো প্রশ্ন করা হবে না। তা হলে কি শিক্ষার্থীরা টেকস্ট বই ছুঁয়ে দেখবে? টেকস্ট বইয়ের কি দরকার ছিল তাহলে? মাধ্যমিক পর্যায়ে এখনও যারা ইংরেজি পড়াচ্ছেন তাদের কজনের পক্ষে সম্ভব নতুন প্রশ্ন তৈরি করা? সবচেয়ে বড় কথা, এই শিক্ষকদের কোনো প্রশ্ন নিজেদের তৈরি করতে হয় না। এখন প্রশ্ন তৈরি করাই তারা অনেকে ভুলেই গেছেন বা সে ধরনের দক্ষতা হারিয়ে ফেলেছেন। তারা বাজারের বই থেকেই প্রশ্ন তুলে দেন। এনসিটিবি যা করতে পারত তা হচ্ছে একই ধরনের বা একই আইটেমের প্রশ্ন প্রতি বছর হবে না, টেকস্ট বইয়ের আইটেমের মতোই প্রশ্ন হবে তবে প্রতি বছর একই ধররেন প্রশ্ন তৈরি করা হবে না। যেমন, এতদিন ছিল যে এক নম্বরে বহুনির্বাচনী প্রশ্ন, দুই নন্বরে সত্য/মিথ্যা ইত্যাদি। সত্য/মিথ্যা এক বছর দিলোই না, কিংবা শিক্ষার্থীদের বলা হতো যে দেওয়া প্যাসেজ থেকে তিনটি সত্য এবং দুটো মিথ্যে স্টেটমেন্ট/বাক্য তৈরি কর। তাহলে তাদের ইংলিশ ল্যাংগুয়েজের ডেভেলপমেন্ট যাচাই করা যেত। এটি করতে পারলেই একটি অরজিনাল টেস্ট নেওয়া হতো। পূর্ববর্তী সিলেবাসে লেখা ছিল, বই থেকে হুবহু প্যাসেজ তুলে দেয়া যাবে না। বইয়ের  প্যাসেজটির থিম ঠিক রেখে প্যাসেজটি পুনরায় লিখতে হবে। কিন্তু কেউ তা করেনি বরং বাজারের বই থেকেই সবাই প্রশ্ন তৈরি করা শুরু করেছিল। এবার অবস্থা হয়তো আরও খারাপ হবে। একই ধররেন প্রশ্ন বছরের পর বছর করা হতো, শিক্ষার্থীদের বেসিক টেস্ট করা হতো না।

এনসিটিবি কোনো ধরনের মডেল প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করেনি- ভালো কথা। কিন্তু হঠাৎ করে বার বার পরিবর্তন করে মডেল প্রশ্ন দেওয়ার কী প্রয়োজন ছিল? তারা কি সিন্ধান্ত নিতে পারছেন না যে, কী ধরনের প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করা হবে? নাকি অন্য কোনো উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য এরকম লুকোচুরি খেলা খেলছেন, বুঝতে খুবই কষ্ট হচ্ছে। রুট লেভেলের হাজার হাজার শিক্ষকদের সাথে আমরা কাজ করি, প্রশিক্ষণ প্রদান করি। বিভিন্ন ধরনের আলোচনা হয় তাদের সাথে। দেখলাম ইংরেজি প্রশ্নের ধরন কী হবে তা নিয়ে তারা অনেকটাই কনফিউজড।

পড়াশুনা ব্যাপারটি থাকবে সবার জন্য উন্মুক্ত, আর আমরা দেখছি শুধুই লূকোচুরি খেলা। কেন এ খেলা ? পুরো ইংরেজি শিক্ষক সমাজ অন্ধকারের মধ্যে আছেন, কেউই প্রশ্নপত্র সম্পকের্ সঠিক কিছু বলতে পারছেন না। ব্যাপারটি এরকম হলো কেন? শিক্ষক ছাত্রছাত্রীদের এক ধরনের সাসপেনসের মধ্যে রেখে এনসিটিবি কর্তৃপক্ষ কী মজা পাচ্ছে জানি না। জেএসসির সর্বশেষ মডেলে দেখা যাচ্ছে পাঠ্যবইবহির্ভূত তিনটি প্যাসেজ থাকবে যার প্রথমটি থেকে বহুনির্বাচনী প্রশ্ন তা আবার শুধু শব্দার্থ, দ্বিতীয় নম্বরে প্রশ্নোত্তর। দ্বিতীয় প্যাসেজ থেকে ইনফরমেশন টেবিল পূরণ করা। তৃতীয়টি থেকে সামারি লিখতে হবে। এছাড়া গ্যাপ ফিলিং ক্লুছাড়া, ক্লুসহ গ্যাপ ফিলিং, রিঅ্যারেঞ্জ, ম্যাচিংগুলোও আনসিন হবে। আইটেমগুলো ভালো কিন্তু পাবলিক পরীক্ষায় যাতে কোনো গাইড বই থেকে সরাসরি এগুলো তুলে দেওয়া না হয়- তা হলে সব উদ্দেশ্যেই ব্যর্থ হবে। সর্বশেষ মডেলের প্যাসেজ বিদেশি বই থেকে তুলে দেওয়া হয়েছে। আবার বলা হচ্ছে, বইয়ের প্যাসেজের অনুরুপ প্যাসেজ তৈরি করে প্রশ্ন করতে এবং সেই পদ্ধতি অনুসরণ করে বাজারে বিভিন্ন ধরনের বই বেরিয়েছে। কেউ কেউ পুরনো বই থেকে প্যাসেজ তুলে দিয়েছে, কেউ বর্তমান বইয়ের প্যাসেজের মতো পূর্বের কারিকুলামের বই থেকে প্যাসেজ তুলে দিয়েছে। কেউ বা আবার একেবারেই অন্য ধরনের প্যাসেজ দিয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদেরকে যে শুধু সাগরে ফেলে দেওয়া হচ্ছে তা নয়, গাইড  ও নোটবুককে দ্বিগুণ উৎসাহিত করা হচ্ছে। এখন যেটি হবে, বোর্ড পরীক্ষায় যখন প্রশ্ন প্রণয়ন করা হবে তখন দেখা যাবে নির্দিষ্ট একটি গাইড বই থেকে মডেল তুলে দেওয়া হয়েছে আর সাথে সাথে ওই গাইডবুকটিই বাজারে গুরুত্বসহকারে সবাই কিনছে। প্রতিবছর যা হচ্ছে তাই হয়ত হবে। এই বিষয়টি বোর্ড এবং এনসিটিবি কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করার জন্য অনুরোধ করছি। 

যদি এমন করা হতো যে, এনসিটিবি কর্তৃক বই গাইডলাইন আকারে থাকবে এবং প্রশ্ন বাজারের কোনো ধরনের বই থেকে কোনোভাবেই নেয়া যাবে না, তবে প্রাকটিসের জন্য শিক্ষার্থীরা যে কোনো বই অুনশীলন করতে পারে তাহলে সমস্যার অনেকটাই সমাধান হতো এবং ইংরেজি পরীক্ষা সঠিক গ্রহণযোগ্যতা পেত।

মাছুম বিল্লাহ: প্রোগ্রাম ম্যানেজার, ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচি, ব্র্যাক এবং ভাইস-প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ টিচার্স এসোসিয়েশন (বেল্টা), ঢাকা, বাংলাদেশ।

Previous articleশঙ্কা কাটেনি জেএসসি এবং জেডিসি পরীক্ষার্থীদের
পরবর্তী লেখাবাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থায় বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে প্রস্তাবনা
গৌতম রায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে শিক্ষায় স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে শিক্ষা-গবেষক হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেন ব্র্যাকের গবেষণা ও মূল্যায়ন বিভাগে। পরবর্তীতে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-এ যোগ দেন গবেষণা ও মূল্যায়ন সমন্বয়ক হিসেবে। সেখান থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে শিক্ষকতা পেশায় আসেন। তিনি আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ও পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট উভয় পর্যায়ে শিক্ষা-গবেষণার সাথে সম্পর্কিত কোর্সসমূহ যেমন—শিক্ষায় গবেষণা পদ্ধতি, শিক্ষায় মূল্যায়ন ও পরিমাপ, শিক্ষায় কর্মসহায়ক গবেষণা, শিক্ষা গবেষণায় পরিসংখ্যান ইত্যাদি কোর্সসমূহ পড়াচ্ছেন। পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষা বিষয়ে বিভিন্ন গবেষণার সাথেও যুক্ত রয়েছেন। গবেষক হিসেবে তিনি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা, শিক্ষায় মূল্যায়ন পদ্ধতি, শিক্ষা ও আইসিটি, কমিউনিটির সম্পৃক্ততা, শিক্ষায় প্রবেশগম্যতা, শিক্ষা প্রকল্প মূল্যায়ন ইত্যাদি বিষয়ে ৩০টিরও বেশি গবেষণা প্রজেক্টের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শিক্ষা-বিষয়ে তাঁর একাধিক গবেষণাভিত্তিক প্রবন্ধ বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে এবং একাধিক বই প্রকাশিত হয়েছে। শিক্ষা-বিষয়ে নিয়মিত লিখছেন বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও অনলাইন মিডিয়ায়। তিনি ‘বাংলাদেশের শিক্ষা’ ওয়েবসাইটের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here