সহযোগিতামূলক মনোভাবে শিখন দীর্ঘস্থায়ী হয়
সহযোগিতামূলক মনোভাবে শিখন দীর্ঘস্থায়ী হয়

গৌতম রায়


বাংলাদেশ ব্যুরো অব এডুকেশনাল ইনফরমেশন অ্যান্ড স্ট্যাটিসটিকস (ব্যানবেইস) কিছুদিন আগে তাদের ওয়েব সাইটে সর্বশেষ ২০১১ সালের শিক্ষা জরিপের ফলাফল প্রকাশ করেছে। জরিপে দেখা যাচ্ছে, দেশে প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে নেট ভর্তির হার প্রায় ৯৫ শতাংশ, অর্থাৎ ৬-১০ বছর বয়সী শিশুদের ৯৫ ভাগ বিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে। ধারণা করা যায়, বিদ্যালয়ে ভর্তির উপযোগী যে পাঁচ ভাগ শিক্ষার্থী ভর্তি হতে পারছে না, তাদের বড় অংশ বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বা প্রান্তিক অবস্থানে থাকা শিশু। দুর্গম হাওর, চরাঞ্চল কিংবা পার্বত্য এলাকার অনেক শিশুই বিদ্যালয়ে সময়মতো ভর্তি হতে পারে না। জরিপে আরও দেখা যাচ্ছে, যারা প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হচ্ছে, তাদের প্রায় চল্লিশ ভাগ পঞ্চম শ্রেণি পাশের আগেই বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ছে। ঝরে পড়ার হার সবচেয়ে বেশি চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে।

৮-১৪ বছর বয়সী শিশুদের যারা কোনো কারণে বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে না, বা ভর্তির পর ঝরে পড়ে, তাদেরকে শিক্ষার দ্বিতীয় সুযোগ দেওয়ার জন্য দেশে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা বিদ্যমান। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার আয়োজনে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাগুলোও বড় ভূমিকা পালন করছে। দেশীয় এনজিওর মধ্যে ব্র্যাক, ঢাকা আহসানিয়া মিশন, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র, গণসাহায্য সংস্থা, প্রশিকা, আরডিআরএস ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বা করছে। বিদেশি উন্নয়ন সংস্থা যেমন কনসার্ন, কারিতাস, সেভ দ্যা চিলড্রেন ইত্যাদি ছাড়াও অন্যান্য দাতাগোষ্ঠীও এ কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সহযোগিতায় অনেক জেলায় শেয়ার শিক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে যাদের অন্যতম লক্ষ্য গুণগত উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা নিশ্চিত করা।

গণসাক্ষরতা অভিযান (CAMPE) অনেক আগে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ডেটাবেজ তৈরি করে, যাতে দেখা যায় দেশে প্রায় পাঁচশর মতো প্রতিষ্ঠান এ কাজে সম্পৃক্ত রয়েছে। এর বাইরে সরকার রিচিং আউট অব স্কুল চিলড্রেন বা রস্ক প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায় বাস্তবায়ন করছে। গুণগত মান বিচারে সবাই যে একই ধরনের শিক্ষা প্রদান করছে, তা বলা যাবে না; কিন্তু এ শিক্ষার জন্য দেশব্যাপী যে আয়োজন, তাকে বিশাল বললে অত্যুক্তি হবে না। এদেশ উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা-অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ। স্বাধীনতার পর থেকেই এ ধরনের কার্যক্রম শুরু হয় এবং গত আশি ও নব্বইয়ের দশকে দেশে এই শিক্ষার যে জোয়ার দেখা গেছে তা এখনও বিদ্যমান।

জরিপে শিক্ষার্থীদের ভর্তি ও ঝরে পড়ার যে হিসাব পাওয়া যায়, তাতে স্পষ্ট যে, দেশে বিপুল পরিমাণ শিক্ষার্থীর জন্য উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার প্রয়োজন। কিন্তু যে ধরনের ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বর্তমানে এই শিক্ষা পরিচালিত হচ্ছে, সেটি কতোটা সাশ্রয়ী ও উপযুক্ত, তা নিয়ে দ্বিতীয়বার ভাবার সময় এসেছে। যেমন- একদিকে স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়সমূহ যখন তাদের ক্যাচমেন্ট এলাকায় প্রায় শতভাগ ভর্তির সাফল্য দাবি করছে; তখন এই একই এলাকায় একাধিক এনজিও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষাকার্যক্রম চালাচ্ছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় শতভাগ শিক্ষার্থী ভর্তি হলে এনজিও বিদ্যালয়সমূহ এতো শিক্ষার্থী পাচ্ছে কীভাবে? একেকটি উপানুষ্ঠানিক বিদ্যালয়ে সাধারণত ২৫-৪০ জন শিক্ষার্থী থাকে। এদের প্রায় অর্ধেক-সংখ্যক যদি আগেই পড়ালেখা থেকে ঝরে পড়ে তাহলে বাকি অর্ধেক নতুন হওয়ার কথা। এই নতুন শিক্ষার্থীদের নাম যদি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের খাতায় তোলা থাকে, তাহলে তো উপানুষ্ঠানিক বিদ্যালয় খালি থাকার কথা! অনেক সময় স্থানীয় প্রাথমিক ও উপানুষ্ঠানিক উভয় বিদ্যালয়ে একই শিক্ষার্থীকে ভর্তি দেখানোর অভিযোগ শোনা যায়- এগুলো তাহলে সত্যি! অনেকক্ষেত্রে উপানুষ্ঠানিক বিদ্যালয়ের নানা বিষয় নিয়ে দুর্নীতির খবরও পত্রিকায় আসে। সেগুলো সত্যি হলে বলতে হবে, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষায় যে বিনিয়োগ হচ্ছে, তার বড় অংশ অপচয় হচ্ছে শুধু সমন্বয়হীনতার কারণে। দেশের কোন এলাকায় কতো শিক্ষার্থীর জন্য কয়টি উপানুষ্ঠানিক বিদ্যালয় প্রয়োজন, সে-সম্পর্কিত নির্ভরযোগ্য ডেটাবেজ নেই। দেখা যায়, একটি এলাকায় হয়তো একাধিক সংস্থা কাজ করছে; আবার অন্য এলাকায় উপানুষ্ঠানিক বিদ্যালয় প্রয়োজনের তুলনায় কম। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষাকার্যক্রম চালানোর ক্ষেত্রে পারস্পরিক সমন্বয় না থাকলে এমনটি হওয়ারই কথা। সমন্বয় থাকলে হয়তো দেখা যেত, শিক্ষার্থীসংখ্যা বিচারে একটি এলাকায় একাধিক সংস্থার কাজ করার প্রয়োজন নেই। সেক্ষেত্রে কর্মরত সংস্থাগুলোকে দেশের বিভিন্ন জোনে ভাগ করে একেকটি সংস্থাকে একেকটি এলাকার দায়িত্ব দেয়া যেত। তা করা গেলে একই শিক্ষার্থীকে একাধিক বিদ্যালয়ে ভর্তি দেখানোর প্রবণতা যেমন কমতো, তেমনি উপানুষ্ঠানিক শিক্ষাকে সাশ্রয়ী ও কার্যকর করা সম্ভব হতো।

একেকটি সংস্থা একেকভাবে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা বাস্তবায়ন করছে। ফলাফলও হচ্ছে একেকরকম। অনেক উপানুষ্ঠানিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করছে; বিপরীতে অনেক বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কম নয়। তাছাড়া যারা ৮-৯ বছর বয়সে উপানুষ্ঠানিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে, তাদের বয়স ও সুযোগ থাকে পঞ্চম শ্রেণি পাশ করে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার। কিন্তু যারা ১২-১৪ বছর বয়সে উপানুষ্ঠানিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়, তাদের অধিকাংশই পঞ্চম শ্রেণি পাশের পর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির বদলে উপার্জনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। বাস্তবতার নিরিখেও তাদের বয়সটি মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়ালেখার অনুকূলে থাকে না। ফলে এসব বিষয় বিবেচনা করে অনেকে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করতে আগ্রহী হয় না। অন্যদিকে একটু বয়সী শিক্ষার্থীরা উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে এমন কোনো দক্ষতা নিয়ে বের হয় না যা তাদের কর্মজীবনে সরাসরি কাজে লাগতে পারে। সাম্প্রতিককালে অনেক বিদ্যালয় মাল্টিগ্রেড পদ্ধতিতে শিক্ষাদান শুরু করেছে। এ পদ্ধতিতে দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে শিক্ষার্থীদেরকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করে একই শ্রেণিতে একাধিক শ্রেণির পড়ালেখা-কার্যক্রম চালানো হয়। এর অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে, দক্ষতা থাকা সাপেক্ষে বেশি বয়সী শিক্ষার্থীদের যেন নতুন করে প্রথম শ্রেণি থেকে পড়ালেখা শুরু না করতে হয় এবং তারা যেন দ্রুত মাধ্যমিক শ্রেণিতে পড়ার সুযোগ পায়। কিন্তু এ পদ্ধতি কার্যকর করার জন্য শিক্ষকের যে পরিমাণ দক্ষতা থাকা বা বিদ্যালয়ের যে প্রস্তুতির প্রয়োজন, তা খুব কম ক্ষেত্রেই রয়েছে।

উপানুষ্ঠানিক শিক্ষায় বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা প্রচুর; কিন্তু অভিজ্ঞতাগুলো প্রত্যেক সংস্থার আলাদা আলাদা। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর দায়িত্ব হওয়া উচিত সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার কার্যক্রমগুলোকে সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার বিশাল বিনিয়োগকে বিবেচনায় নিয়ে কার্যক্রমটিকে ফলপ্রসূ করার জন্য এটি করা খুবই জরুরি। তাতে অনাবশ্যক ব্যয় কমানো সম্ভব। তাছাড়া উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার পর শিক্ষার্থীদের পরবর্তী গন্তব্য মাধ্যমিক শিক্ষা হবে নাকি কর্মজীবনের জন্য তাদের দক্ষ করে তোলা হবে, সেসব বিষয়েও বাস্তবতার নিরিখে সুনির্দিষ্ট নীতি থাকা প্রয়োজন। প্রয়োজন এই শিক্ষাকে মানসম্পন্ন করার জন্য প্রতিটি সংস্থার কারিকুলাম ও শিক্ষাদান পদ্ধতি পর্যালোচনা করা। সব মিলিয়ে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার প্রতিটি উপাদান নিয়েই দ্বিতীয় ভাবনার সময় এসেছে। এ কাজে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোরই নেতৃত্ব দেয়া উচিত।

Previous articleরাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী আইন বিভাগ
পরবর্তী লেখাশিক্ষা নিয়ে আতঙ্কের বছরে জেএসসি ও জেডিসির ফল
গৌতম রায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে শিক্ষায় স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে শিক্ষা-গবেষক হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেন ব্র্যাকের গবেষণা ও মূল্যায়ন বিভাগে। পরবর্তীতে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-এ যোগ দেন গবেষণা ও মূল্যায়ন সমন্বয়ক হিসেবে। সেখান থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে শিক্ষকতা পেশায় আসেন। তিনি আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ও পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট উভয় পর্যায়ে শিক্ষা-গবেষণার সাথে সম্পর্কিত কোর্সসমূহ যেমন—শিক্ষায় গবেষণা পদ্ধতি, শিক্ষায় মূল্যায়ন ও পরিমাপ, শিক্ষায় কর্মসহায়ক গবেষণা, শিক্ষা গবেষণায় পরিসংখ্যান ইত্যাদি কোর্সসমূহ পড়াচ্ছেন। পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষা বিষয়ে বিভিন্ন গবেষণার সাথেও যুক্ত রয়েছেন। গবেষক হিসেবে তিনি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা, শিক্ষায় মূল্যায়ন পদ্ধতি, শিক্ষা ও আইসিটি, কমিউনিটির সম্পৃক্ততা, শিক্ষায় প্রবেশগম্যতা, শিক্ষা প্রকল্প মূল্যায়ন ইত্যাদি বিষয়ে ৩০টিরও বেশি গবেষণা প্রজেক্টের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শিক্ষা-বিষয়ে তাঁর একাধিক গবেষণাভিত্তিক প্রবন্ধ বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে এবং একাধিক বই প্রকাশিত হয়েছে। শিক্ষা-বিষয়ে নিয়মিত লিখছেন বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও অনলাইন মিডিয়ায়। তিনি ‘বাংলাদেশের শিক্ষা’ ওয়েবসাইটের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here