বাংলাদেশের শিক্ষা - ছোট
বাংলাদেশের শিক্ষা - ছোট


নাসরীন সুলতানা মিতু: ছোটবেলায় বড় বড় পরীক্ষায় ততোধিক বড় বড় রচনা লিখতে হতো আমাদের। বাংলা ও ইংরেজি দুটো সাব্জেক্টেই- এইম ইন লাইফ বা জীবনের লক্ষ্য। ভবিষ্যৎ ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ারদেরদের ভিড়ে পরীক্ষার হল উপচে পড়ত। খাতার পর খাতা, পাতার পর পাতা। শিক্ষকরা নাকে চশমা এঁটে সেই বিশাল সাহিত্যে বানান ভুল খুঁজে বেড়াতেন, বাকি কিছু না দেখলেও চলে। একই বই বা গাইড থকে উগড়ে দেয়া কয়েকশ ছেলেমেয়ের জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের বিশেষ পার্থক্য থাকার কথা না! নিজের ছোটবেলার কথা বলছি যদিও; এখনকার ছেলেমেয়েরাও সেই ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার মরণপণ শপথ থেকে খুব একটা সরে এসেছে বলে মনে হয় না!

মুখস্থবিদ্যার খপ্পরে পড়ে ছোটবেলার সেই রচনা লিখতে গিয়ে আমাদের আসল ‘এইম’ উদ্ঘাটিত না হলেও আমাদের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় কিন্তু আমাদের খুব সুনির্দিষ্টভাবে জীবনের লক্ষ্য ঠিক করে দিয়েছে!

আমাদের জীবনের লক্ষ্য ‘শিক্ষিত’ হওয়া, লুঙ্গি বদলে প্যান্ট পড়া, স্যান্ডেল খুলে শু পড়া; বাইসাইকেল ফেলে নিদেনপক্ষে একটা ‘টয়োটা করলা’ কেনা, এবং এসবকিছুর জন্য প্রথমে একটা ‘ভালো’ চাকরিতে ঢোকা!

ভাবি, আপনার ছেলে বাসায় নেই? গেছে কই? অফিস ট্যুরে সিঙ্গাপুর? বাহ! বাহ! ও কোথায় আছে এখন? কোন টেলিকম? বেতন কত? ওরে ব্বাপস!! ও আসলে ছোটবেলা থেকেই অনেক ভালো ছাত্র ছিল তো! এসএসসি, এইচএসসিতে গোল্ডেন ফাইভ পাওয়া। আগেই জানতাম ও অনেক ভালো কিছু করবে!

আমাদের দেশের নব্বই ভাগ ‘ভালো’ শিক্ষার্থী এইটুকু পড়ে চোখ কচলে তাকাবে, আহা! এমন একটা চাকরি কি আছে তার কপালে? পরের সেমিস্টারে কোমরবেঁধে পড়াশোনা করতে হবে! হুঁ হুঁ বাবা, দ্যাখো কী রেজাল্ট করি এবার! আর ইদানিং চাকরির বাজারে ইংরেজির যা কদর! স্পোকেনের কোর্সটাও শুরু করতে হবে এবার! গ্রাম থেকে আসা ক্ষ্যাত ছেলেগুলার চেয়ে ইংরেজি ঢের ভালো তার এমনিতেই, একটু চর্চা করলে আর কেউ দাঁড়াতে পারবে না!

লেখাপড়া করে যে, গাড়িঘোড়া চড়ে যে- মধ্যযুগের শ্লোক। তার মানে মধ্যযুগেও লেখাপড়ার উদ্দেশ্য সেই গাড়িঘোড়াতেই ছিল। সময়ের তোড়ে ঘোড়ার জায়গায় মোটর জুড়েছে, কিন্তু লেখাপড়ার উদ্দেশ্য কি পাল্টেছে? আমরা কি আদৌ চাই পাল্টাতে? ঔপনিবেশিক শাসকের কেরানি হওয়ার জন্য প্রবর্তিত যেই শিক্ষাব্যবস্থা, সেখান থেকে এই স্বাধীন দেশের আমরা ঠিক কতটুকু সরে এসেছি? পার্থক্য এই যে ব্রিটিশরাজের বদলে হুকুমের প্রভু এখন কর্পোরেট কোম্পানিগুলো। ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বছর আগেও মানুষের যেই ইনকামের রেঞ্জ ছিল, রাতারাতি যেন তা বদলে গেল এই বাণিজ্যের দুনিয়ায়। নিম্ন-আয়ের চাকরিগুলোর বেতনের খুব হেরফের না হলেও উপরের দিকে গ্রাফ উঠেছে লাফিয়ে লাফিয়ে। এবং হঠাৎ করেই আমাদের প্রয়োজনের ধরনও গেছে বদলে। বাসায় বিশাল এলসিডি স্ক্রিনের টিভি আর হাতে আইফোন না থাকলে ঠিক যেন চলছে না! এক পড়তি স্টাইলের শাড়ি গিন্নি আর কতদিন পরবে? অফিস পার্টিতে কলিগদের কাছে ইজ্জত থাকে না যে! বান্ধবীর বাচ্চার জন্মদিনের অনুষ্ঠান হচ্ছে গুলশানের বিশাল কাঁচঘেরা বুফে রেস্তোরাঁয়, সেখানে ছোটখাটো গিফট নিলে মুখ থাকে? এতোসব ভুঁইফোড় সামাজিক চাহিদা বাদ দিলেও আরও নানা রঙের চাহিদার অপশন তৈরি করতে একপায়ে খাড়া ভারতীয় সমাজের রঙিন মুখোশস্বরূপ বলিউডি চ্যানেলগুলো কিংবা নানা পণ্যের বিজ্ঞাপনের কালার প্যালেট। সামাজিক এই সব খণ্ডচিত্রের দীর্ঘমেয়াদী ফলস্বরূপ সমাজে; বিশেষত শহুরে সমাজে একইসাথে জন্ম নেয় এক ধরনের উন্নাসিকতা এবং হীনমন্যতা; বিপদজনকভাবে যখন মানুষের স্ট্যাটাসের একমাত্র পরিমাপক হল অর্থনৈতিক মানদণ্ড।

এতটুকু পড়ে মনে হতে পারে ধান ভানতে শিবের গীত গাইছি কেন। কেউ কেউ এর মাঝে কমিউনিজমের গন্ধও পেতে পারেন! একটু খোলাসা করি।

একটি দেশের সার্বিক সমাজব্যবস্থায় অনেকগুলা সম্প্রদায় থাকে, অনেকগুলি ইউনিট থাকে; প্রত্যেকটা অংশের পারষ্পরিক মিথষ্ক্রিয়াতেই সমাজ এগিয়ে যায়। এখন আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে একটু তাকাই। শিক্ষা মানুষের সামাজিকীকরণের একটি বড় মাধ্যম। মানুষকে সমাজের উপযুক্ত করে গড়ে তোলা শিক্ষার একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। শৈশব থেকে যদি শুরু করি, সমাজের একটি অংশ হিসেবে তাকে গড়ে তুলতে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কতটুকু কার্যকর? আমাদের দেশে একসময় স্কুলের স্বল্পতা থাকলেও এখন অন্তত শহরাঞ্চলে স্কুল আর দুষ্প্রাপ্য নয়। বরং ক্ষেত্রবিশেষে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি; মানের ব্যাপারে প্রশ্ন থাকলেও। এখন এমনকি আবাসিক এলাকাতেও বাচ্চাদের স্কুল দু-একটা থাকেই; তারপরেও কোনো এক রহস্যজনক কারণে আগের দিনের মতোই দুই-তিন ক্রোশ পথ পাড়ি দিয়ে পুরো শহরে যানযট বাঁধিয়ে বিশাল গন্ধমাদনের ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে স্কুলে যায় স্কুল্গামী শিশুরা। কারণ একটাই- ‘ভালো’ স্কুলে পড়া!

এখন প্রশ্ন হল- এই ভালো স্কুলের সংজ্ঞা কী?

ঢাকা শহরকে বিবেচনায় রাখলে এখানকার তথাকথিত ভালো স্কুলগুলোকে একটু লক্ষ্য করি। বাচ্চা ‘মানুষ’ করার ক্ষেত্রে কোনো এক অদ্ভুত কারণে জীবন-সমাজবিচ্ছিন্ন বিজাতীয় ভাষার বিজাতীয় কারিকুলামের ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোর োপর আমরা ভরসা করি বেশি! দীর্ঘদিন ইংরেজিভাষী গোত্রের দাসত্ব মস্তিষ্কে এখনও চেপে আছে আমাদের, কিন্তু এটাই কি একমাত্র কারণ?

ইংরেজি জানাটা আমাদের দেশে ‘এলিট’ হবার পূর্বশর্ত, সে বহুকাল আগে থেকেই। কিন্তু সমস্যা গুরুতর হওয়া শুরু করে যখন এই ব্রাহ্মণত্ব আরোপ করা শুরু হয় শৈশব থেকে। ঢাকা শহরের একাধিক স্বনামধন্য ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের কথা জানি, যেখানে বাচ্চা ভর্তি করতে হলে শুধু বিশাল মোটা অঙ্কের টাকাই যথেষ্ট নয়, বাবা-মাকে আলাদা ইন্টারভিউ দিতে হবে নিজেদের যথেষ্ট ‘যোগ্য’ পরিবার হিসেবে প্রমাণ করার জন্য। এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে বাবা-মাকে তাদের উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হয়, আক্ষরিক অর্থে সার্টিফিকেট দেখিয়ে! স্বাভাবিকভাবেই এই অসুস্থ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যে ‘সৌভাগ্যবান’ শিশুরা এই কুলীন স্কুলগুলোতে ভর্তি হয়, তাদের পারিবারিক ও সামাজিক অবস্থান হয় খুবই সাদৃশ্যপূর্ণ। ফলে এই শিশুদের কখনোই জানার সুযোগ ঘটে না যে তাদের একটা ‘ক্লাস পার্টির’ যে বাজেট, এই দেশের অধিকাংশ পরিবারের কয়েক মাসের যাবতীয় খরচ তাতে অনায়াসে হয়ে যায়! একটি স্বাচ্ছন্দ্যের বুদবুদের মধ্যে অপুষ্ট শৈশব কেটে যায় এই ব্রয়লার শিশুদের, জীবন সম্পর্কে কোনো বাস্তব জ্ঞান ছাড়াই!

ইংরেজি মাধ্যম তো গেল, ঢাকা শহরের বেশিরভাগ নামিদামি বাংলা মাধ্যমের স্কুলগুলোর চিত্রও কিন্তু খুব আলাদা নয়। এখানেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা সামাজিকভাবে মোটামুটি ‘হোমোজেনাস’, ফলে সমাজের অন্য ‘স্ট্যাটাসের’ সমবয়সীদের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ তাদের কখনোই ঘটে না। নিজেদের ‘গোত্রের’ বাইরের কাউকে নিজের জায়গায় বসিয়ে চিন্তা করাটা তাই তাদের কাছে হয়ে দাঁড়ায় অসম্ভবের কাছাকাছি। বন্ধুর বাবাকে দেখলে সালাম দিয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়া ভদ্র ছেলেটিও তাই একই বয়সী রিকশাওয়ালাকে নির্দ্বিধায় হাঁক দিয়ে বলে, ‘এই খালি যাবি?’ আমাদের শিক্ষা ‘অপ্রেসড’দের জন্য নয়। আমাদের শিক্ষা অর্থনৈতিক মানদণ্ডে নিচের সারির মানুষদেরকে তাদের আত্মমর্যাদার জায়গাটা দেখিয়ে দিতে ব্যর্থ; তাই প্রতিনিয়ত অপমানিত দুর্বল রিকশাওয়ালা নতমুখে তাকে নিয়ে রওনা দেয় গন্তব্যে। যাত্রীর আসনে বসা কানে ইয়ারফোন গোঁজা ছেলেটির মাথায়ও আসে না যে চালক মানুষটির সন্তানও হয়তো তারই বয়সী, সামাজিকভাবে তার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সস্তা স্কুল বা মাদ্রাসা তার এখনকার ঠিকানা। একটি মানুষকে বিচার করার অনেকগুলো মানদণ্ডের মধ্যে সবচেয়ে স্থুল যে অর্থনৈতিক মানদণ্ড; তাই দিয়েই নিয়ন্ত্রিত হয় এই ‘অসামাজিক প্রজন্মের’ যাবতীয় আচরণ ও বুদ্ধি বিবেচনা। রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া খালি গায়ে লুঙ্গি পরিহিত প্রৌঢ় তাই তার ততোটা শ্রদ্ধা ও মনোযোগ কাড়তে পারেন না, যতটা পারেন পাজেরো-আরোহী স্যুটেড আঙ্কেল। এই উচ্চ-মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণীর ছেলেমেয়েদের একটি বিরাট অংশ সাধারণের নাগালের বাইরের দামি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হয়ে কুলীন সমাজে নিজেকে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। একটি ক্ষুদ্র ভাগ্যবান অংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পায় ও জীবনে প্রথমবারের মত নিজের গণ্ডির বাইরের মানুষদের সংস্পর্শে এসে কিছুটা হলেও সামাজিকতার স্বাদ পায় (সম্ভবত বাংলাদেশে একমাত্র পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই সব সামাজিক শ্রেণীর সহাবস্থান ধরে রেখেছে এখন পর্যন্ত। আর এই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে ‘সুশীল সমাজ’ শ্রেণীটির উদ্ভব!)।

কিন্তু সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন এই এলিট গোত্র; অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যারা দেশের মূল অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক; দেশের আমজনতার সাথে তারা কীভাবে একাত্ম হবে যেখানে সাধারনের জীবনযাপন, মূল্যবোধ সম্পর্কে তাদের বিন্দুমাত্র ধারণা নেই?

এতক্ষন যেই গোত্রের কথা হলো তারা সমাজের মুষ্টিমেয় কুলীন সম্প্রদায়। এবার একটু অন্যদিকে তাকাই।

একটি স্বাধীন দেশের বিয়াল্লিশ বছর অতিক্রান্ত হবার পরেও আমরা এখন পর্যন্ত আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে পারিনি যাতে তা ‘চাকরির নিমিত্তে’ পড়ালেখা- এই ধারণা থেকে বের হয়ে আসতে পারে। সমাজের তুলনামূলক কম স্বচ্ছল ও অস্বচ্ছল পরিবারের সন্তানদের তাই গোটা শিক্ষাজীবন চলে যায় একটি স্বচ্ছল ভবিষ্যতের আশায়। শিক্ষার একটি কাজ অবশ্যই মানুষের অবস্থার পরিবর্তন করতে সাহায্য করা, কিন্তু তার মানে অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতার জন্য তাকে হীনমন্যতার দিকে ঠেলে দেয়া নয়। চকচকে কর্পোরেটদের দিকে তাকিয়ে বড় বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলা তরুণদের আত্মবিশ্বাসী করতে পুরোপুরি ব্যর্থ আমাদের শিক্ষা। যার ফলে ক্রমান্বয়ে জন্ম নেয় হতাশা, হতাশা থেকে ক্রোধ।

এই ভারসাম্যহীনতার চূড়ান্ত প্রতিফলন আমরা দেখি মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষার ক্ষেত্রে। কুলীন সমাজে এই দুই গ্রুপ পুরোপুরি অপাংক্তেয়। অথচ কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা একটি দেশের উন্নয়নে বিরাট অবদান রাখতে সক্ষম, সক্ষম দেশে কার্যকর মানবসম্পদ গড়ে তুলতে; বিশেষত আমাদের মতো জনবহুল দেশে। দুঃখের বিষয় হলেও সত্য, আমাদের শিক্ষিত সমাজেরও বেশির ভাগ মানুষের পরিষ্কার কোনো ধারণাই নেই শিক্ষার এই ধারা সম্পর্কে। মাদ্রাসা শিক্ষার ক্ষেত্রে এই চিত্র আরও ভয়াবহ। বাংলাদেশের নিম্নবিত্ত শ্রেণীর একটি বিশাল অংশের শিক্ষাদানের দায়িত্ব কাঁধে চাপিয়ে দেবার পরেও এই শিক্ষাব্যাবস্থার প্রতি আমাদের নীতিনির্ধাকদের যথাযথ মনোযোগ আকর্ষণ হয়নি কখনোই। বরং মধ্যযুগীয় কারিকুলামের কাঁধে ভর দিয়ে খুঁড়িয়ে চলা এই ব্যবস্থার প্রতি দেশের শিক্ষিত ‘এলিট’দের অবহেলা ও বিমাতাসুলভ সন্দেহপ্রবণ আচরণ তাদের ঠেলে দিয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বীর ভুমিকায়। বড় বড় কথা বলা আমরা প্রগতিশীলরাও শিক্ষার এই ধারার প্রতি আন্তরিকতার প্রমাণ দিয়েছি এমন নজির বিরল। কুয়ার ব্যাং বলে প্রতিনিয়ত উপহাস করেছি কিন্তু কুয়া থেকে টেনে তোলার চেষ্টা করিনি কখনই। এতিমখানায় বড় হওয়া যে ছেলেটির জীবনে একবেলা ভালো খেতে পাওয়া সৌভাগ্যের ব্যাপার, তাকে আমরা বরাবর দেখে এসেছি সন্দেহের চোখে। ড্রইংরুমে এসির বাতাসে বসে দেয়া আমাদের সুশীল থিওরি তাই তাদের বিন্দুমাত্র স্পর্শ করে না। বর্তমানে দেশের রাজনীতির স্মরণকালের ভয়াবহতম টানাপোড়েনের সময় আমরা অভিযোগের তীর নির্দেশ করছি সেই জনগোষ্ঠীর প্রতি, যাদের আমরা নিয়ান্ডারথাল মানুষের থেকে বেশি সম্মান দিতে যাইনি কখনো। তাদের আজকের যেই ক্রোধ তা তো কোনো হঠাৎ ঘটনা নয়!

আজ বগুড়ার যেই সংস্কারাচ্ছন্ন মাদ্রাসার ছেলেটি মনের চোখে চাঁদের বুকে সাঈদীকে দেখে আবেগে চোখে পানি এনে ফেলছে, তার সাথে আমাদের ড্রইংরুমের শিক্ষিতদের পার্থক্য আসলে ঠিক কতটুকু? ব্লগ সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণাহীন যে ছেলেটি আজ ‘নাস্তিক ব্লগার’ জবাই করতে ঢাকায়, তার অজ্ঞানতার জন্য একমাত্র দায়ী আমাদের প্রকট বিভাজিত সমাজ। মানুষের জীবনে বেঁচে থাকতে হলে কিছু না কিছু আঁকড়ে বাঁচতে হয়। ‘শিক্ষিত’ হওয়ার অহঙ্কারে আমরা পায়ে ঠেলেছি এই বঞ্চিত হতাশাগ্রস্থ গোষ্ঠীকে; ‘প্রগতি’ শুধুই একটা শ্রেণীর জন্য- এই সত্য প্রতিষ্ঠা করেছি নির্দ্বিধায়; জীবনে অপশন বেছে নেওয়ার জন্য ধর্ম ছাড়া আর কিছুই তো আমরা রাখিনি তার জন্য। তাই আজ যেই ছেলেটা একজনের মুখের কথায় চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে ছুটে আসে মতিঝিলে, তাকে দুষবো সেই অধিকার আমাদের নেই। আমাদের যুক্তির চেয়ে মাদ্রাসার মাওলানার বয়ানের বিশ্বাসযোগ্যতা তার কাছে অনেক বেশি, এবং সেটি যতটা না সেই মৌলভীর যোগ্যতা, তার চেয়ে অনেক বেশি আমাদের ব্যর্থতা।

এই মুহূর্তে আমাদের দেশ যে সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা যতটা না রাজনৈতিক তার চেয়ে বেশি সামাজিক। একটি অপুষ্ট ব্যর্থ শিক্ষাব্যবস্থার ফলাফল হিসেবে আমরা এই ছোট্ট দেশে জন্ম দিয়েছি একটি প্রচণ্ড ভারসাম্যহীন শ্রেণীব্যবস্থার, সহযোগিতার বদলে সম্পর্কগুলো হয়ে দাঁড়িয়েছে সন্দেহের, আতঙ্কের, প্রতিহিংসার। কৃষিভিত্তিক একটি সমাজে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালাভ করা মানুষ কৃষিকাজ করতে লজ্জ্বাবোধ করে। এই লজ্জ্বা আমরা কোথায় রাখি? ‘ক্ষ্যাত’ শব্দটা যে সমাজে গালি, সেখান থেকে কী আশা করব আসলে আমরা? নীতিবোধ শেখার বদলে ধর্ম ক্লাসে আমরা সারাজীবন যে যার ধর্ম তোতাপাখির মতো মুখস্থ করেছি, সত্যিকারের নৈতিকতা আমাদের কাছেও ঘেঁষেনি! সামষ্টিক চিন্তার বদলে আমরা খালি নিজেরা বড় হতে চেয়েছি, নিজের গণ্ডিতে বসে বাহবা কুড়াতে চেয়েছি; পিছিয়ে পড়া সতীর্থদের টেনে তোলার বদলে বিদ্রূপ করেছি তাদের নিয়ে; ভিন্নমতকে শ্রদ্ধা করার মত সহনশীলতা অর্জন করার বদলে ভিন্নমতের মানুষের সাথে গড়ে তুলেছি বিভেদের প্রাচীর। দেশকে আমার নিজের ভাবতে শিখেছি, ‘নিজেদের’ ভাবতে শিখিনি। নিজেরাই আমরা নিজেদের ঠেলে দিয়েছি অসুস্থতম সঙ্ঘাতের মাঝে।

আমাদের শেকড়হীন শিক্ষা আমাদের অক্ষরজ্ঞান দিয়েছে, অর্থ উপার্জনের উপায় বাতলে দিয়েছে, কিন্তু আমাদের মানুষ করতে পারেনি; নিজেকে, মানুষকে সম্মান করতে শেখায় নি। কাজের থেকে এই সমাজে কাজের পারিশ্রমিক বেশি সম্মানীয়, মনুষ্যত্বের থেকে ব্যাঙ্ক-ব্যালান্স! কোটি কোটি কর্মক্ষম যুবককে উদ্যোক্তা হবার স্বপ্ন দেখতে শেখায়নি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, শিখিয়েছে বহুজাতিক কোম্পানির দাসত্ব করার এটিকেট, টেনে নামিয়েছে অপ্রয়োজনীয় অসম সামাজিক লড়াইয়ে- যেই লড়াই আসলে দিন শেষে নিজের সঙ্গে নিজের।

যতদিন আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এদেশের এক একটি ছেলেমেয়েকে এদেশের জল, হাওয়ার উপযোগী করে ‘আমাদের’ একজন হিসেবে গড়ে না তুলবে; সামাজিক শ্রেণীগুলোর মধ্যে কোনোরকম ভারসাম্য তৈরি করতে না পারবে- এই ধরনের পরিস্থিতি বার বার আসবে। আর সেজন্য দায়ী থাকব আমরাই!

নাসরীন সুলতানা মিতু: প্রভাষক, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

Previous articleব্যয়সাশ্রয়ী স্মার্ট ক্লাশে রাস্পবেরি পাইয়ের ভুমিকা
পরবর্তী লেখাশ্রেণীকক্ষের বাইরে শিক্ষা
গৌতম রায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে শিক্ষায় স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে শিক্ষা-গবেষক হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেন ব্র্যাকের গবেষণা ও মূল্যায়ন বিভাগে। পরবর্তীতে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-এ যোগ দেন গবেষণা ও মূল্যায়ন সমন্বয়ক হিসেবে। সেখান থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে শিক্ষকতা পেশায় আসেন। তিনি আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ও পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট উভয় পর্যায়ে শিক্ষা-গবেষণার সাথে সম্পর্কিত কোর্সসমূহ যেমন—শিক্ষায় গবেষণা পদ্ধতি, শিক্ষায় মূল্যায়ন ও পরিমাপ, শিক্ষায় কর্মসহায়ক গবেষণা, শিক্ষা গবেষণায় পরিসংখ্যান ইত্যাদি কোর্সসমূহ পড়াচ্ছেন। পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষা বিষয়ে বিভিন্ন গবেষণার সাথেও যুক্ত রয়েছেন। গবেষক হিসেবে তিনি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা, শিক্ষায় মূল্যায়ন পদ্ধতি, শিক্ষা ও আইসিটি, কমিউনিটির সম্পৃক্ততা, শিক্ষায় প্রবেশগম্যতা, শিক্ষা প্রকল্প মূল্যায়ন ইত্যাদি বিষয়ে ৩০টিরও বেশি গবেষণা প্রজেক্টের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শিক্ষা-বিষয়ে তাঁর একাধিক গবেষণাভিত্তিক প্রবন্ধ বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে এবং একাধিক বই প্রকাশিত হয়েছে। শিক্ষা-বিষয়ে নিয়মিত লিখছেন বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও অনলাইন মিডিয়ায়। তিনি ‘বাংলাদেশের শিক্ষা’ ওয়েবসাইটের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

9 COMMENTS

  1. লেখাটা ভালো হতে গিয়েও হলোনা । হলনা কারণ আপনি নিজেও সেই শেকড়হীন শিক্ষায় শিক্ষিত । আর তাই শাহবাগের ওয়েব সাইট থেকে ছড়ানো একটা মিথ্যাকে পুনরাবৃতি করলেন, চাদের বুকে সাইদীকে দেখার কথা বলে । আপনিও সেই শ্রেনীকে গালি দিলেন “সংস্কারাচ্ছন্ন মাদ্রাসার ছেলেটি” বলে । যারা মাদ্রাসায় পরে আর সায়েদী যাদের প্রতিনিধিত্ব করে, এই দুই গ্রুপের কেউই “চাদের বুকে” কারো ছবি দেখে না । তাদের আকিদা ভিন্ন । তবে চাদের বুকে ছবি দেখার লোকও আছে এদেশে, তারা যায় সায়েদাবাদীর দরবারে । কিন্তু ওই যে বললেন “শেকড়হীন শিক্ষা” ! এই শিক্ষা আপনি আর আমি যেই শ্রেনীর প্রতিনিধিত্ব করি সেই শ্রেনীকে মাওলানা সাইদী আর পীর সায়েদাবাদীর মধ্যে পার্থক্য কি তা শেখায় না কখনও । আমরা দুই মেরুর দুই পক্ষকে এক নৌকায় ফেলে গালি দেই “সংস্কারাচ্ছন্ন” বলে । ইসলামিক ফিক বা শরিয়া নিয়ে পড়াশোনা করা মেয়েটি যে আমার লজিক ডিজাইন বা মর্ডান ফিজিক্স কোর্সের চেয়েও অনেক জটিল যুক্তি তর্কের তাত্ত্বিক আলোচনায় থিসিস লিখে এসেছে সেটা আমার জানার কথা না । আর এই অজ্ঞানতাই আমার অহংকার ও তাচ্ছিল্যের উত্স ।

    • প্রথমেই ধন্যবাদ সময় নিয়ে দীর্ঘ লেখা পড়ার জন্য!

      অবশ্যই আপনাকে আমার সাথে একমত হতে হবে বিষয়টা তা না, কিন্তু এখানে কিছু কথা উত্তর না দিয়ে পারছি না।
      প্রথমত, এখানে ইংরেজি মাধ্যম, বাংলা মাধ্যম, মাদ্রাসা এই সবগুলো ব্যবস্থারই সমালোচনা করা হয়েছে কিছু নির্দিষ্ট ইস্যুতে, সেজন্য স্বাভাবিকভাবেই যেটা করা হয়েছে সেটা হল জেনারেলাইজেশন। অবশ্যই এই সবগুলো ধারার অনেক ভাল দিক আছে, এখান থেকে পাশ করা বহু জিনিয়াসও বাংলাদেশে আছেন, শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা করা মানে তাদের অস্তিত্ব অগ্রাহ্য করা নয়- তিনি যেই ধারার শিক্ষার্থীই হন না কেন!
      পীর সায়েদাবাদী আর আল্লামা সাঈদীর প্রসঙ্গ কেন আসল আমার কাছে পরিষ্কার নয়। আমি অনেক মাদ্রাসার ছাত্রের কথা নিজে শুনেছি যারা চাঁদে সাঈদীকে নিজে দেখেছে বলে দাবি করে। সেই দাবি যিনি করবেন তিনি যেই ধারার শিক্ষার্থীই হন না কেন, তাকে সংস্কারাচ্ছন্ন বলতে দ্বিধা থাকার কথা না।
      আপনি নিজেই চিন্তা করে দেখুন ‘ইসলামি ফিকহ ও শরীয়া নিয়ে পড়াশুনা করা যেই মেয়েটি মডার্ন ফিজিক্স কোর্সের চেয়ে জটিল তাত্ত্বিক আলোচনায় থিসিস করে এসেছে’ সে কি এই দেশের মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের ‘মেজরিটি’কে প্রতিনিধিত্ব করে কিনা। আমি আবারও বলছি, এখানে সব মাধ্যমের ‘মেজর’ সমস্যার জায়গায় ফোকাস করা হয়েছে; ঠিক যেমন ইংরেজি মাধ্যমে পড়া বহু মানুষকে আমি চিনি যারা অনেক সুশীলের চেয়ে অনেক বেশি সেন্সিবল নিম্নবিত্ত জনসাধারণের ব্যাপারে। কিন্তু তারা কখনই মোটা দাগের ইংরেজি মাধ্যমে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মেজরিটিকে প্রতিনিধিত্ব করেনা।
      আমার মনে হয় কোন বিষয়কে পারসোনালি নিয়ে অফেন্ডেড না হয়ে শিক্ষা ব্যবস্থাকে নিয়ে সামগ্রিকভাবে চিন্তা করলে আমার লজিক বুঝতে আপনার সুবিধে হবে।

      ভাল থাকবেন।

  2. অনেক ভাল লেগেছে, কারন মনে হয়েছে আমি এমন ভাবেই তো ভাবছিলাম। ফেসবুকে এমন ভাবনা শেয়ারও করেছিলাম কিছুদিন আগে।

    মাদ্রাসা পদ্ধতিতে ঠিক কিকি বিষয়, ঠিক কিকি ভাবে পড়ানো হয়, তা সম্পর্কে বিস্তারিত জানার প্রয়োজন বোধ করলাম নুশাইবা আবদুল্লাহ’র মন্তব্য পড়ে।এবং ফিকহ্ বা শরিয়াহ আইনের জটিল যুক্তি তর্কের বিষয়টি সঠিকভাবে না জেনে এই specific বিষয়ে আর মন্তব্য করার অধিকার রাখছিনা বলেই সাব্যস্ত করছি।

    তবে আমার মনে হয়নি এই লেখায় কোথাও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সংস্কারাচ্ছন্ন বলে গালি দেয়া হয়েছে। মনে হয়েছে, তাদের সংস্কার আচ্ছন্নতার কারন উদঘাটনের চেষ্টা করা হয়েছে। কোন ব্যাবস্থার সীমাবদ্ধতা ও এর কারন সম্পর্কে আলোচনা করা কে যদি “গালি দেয়া” হিসেবে চিহ্নিত করে আলোচনা করা হয়, তাহলে অবশ্য ভিন্ন কথা। সেক্ষেত্রে আমাদের অধিকাংশ বাংলা ব্লগের প্রচলিত আচার হিসেবে “সমালোচনা”=“গালি দেয়া” বলেই ধরে নিতে বাধ্য হবো।

    এর বাইরে, আদৌ তারা সংস্কার আচ্ছন্ন, না কি আসলে তারা “শরিয়ত” মোতাবেক “একমাত্র সত্য”র পথের পথিক সেটা এই “কুলীন শিক্ষার” বর্তমান আলোচনায় প্রাসঙ্গিক মনে হয়নি। তবে অবশ্যই সেক্যুলারিজম কে একমাত্র পার্থিব নিশ্চিত লক্ষ্য/পন্থা ধরে কোনো সমাজ-সংস্কার এর absoluteness আজ আর ক্রিটিসিজমের বাইরে নয়।

    মহান আল্লাহ ও তাঁর প্রেরিত দ্বীন-ইসলামের পথ কে আমি ঠিক কোন উপায়ে আত্মস্থ করব সেটা যদি আজ আমি নিজের জানাশোনা ও উপলব্ধির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে না পারি, তাহলে যে আমাকে সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করতে চায় তাঁকে তো আমার সৃষ্টিকর্তার একজন মধ্যস্থতাকারী হিসেবেই চিহ্নিত করব। কিন্তু তেমন কোন মধ্যস্থতাকারীর অবস্থান ইসলামে নাই বলেই ইঙ্গিত পাই “সায়েদাবাদীর দরবার” এর নিকৃষ্টতা হিসেবে। “সাইদী” আর “সায়েদাবাদী” যে ইসলামের মৌলিক হুকুম-আহকামের বিষয়ে আসলে আলাদা সেই জানা-বোঝার পরেও সাইদী যে ঐতিহাসিক বাস্তবতায় বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারের কাজটি করেন, সেটা তো আমি ভুলতে পারলাম না। ফলে সাইদী কে ঠিক কোন context এ, কোন framing এ সমালোচনা করা হবে আর সায়েদাবাদী-কে কোন context এ, কোন framing এ সমালোচনা করা হবে তা তো আমাদের বর্তমান আলোচনার সাথে কোনো ভাবেই প্রাসঙ্গিক নয় বলেই আমার মনে হয়।

    ইসলাম এর শরিয়াহ নিয়ে কোন নি:সংশয় অবস্থান থেকে আলোচনা করার আগে এখানে উদ্ধৃত সংশয়গুলি সমাধান করা আমার জন্য ব্যক্তিগত পর্যায়ে জরুরি বলে মনে হয়েছে:- [{(ইসলামে শিয়া ও সুন্নি দুটি সম্প্রদায় চিরকালই মারামারি করে এসেছে পরস্পরের সঙ্গে। সুন্নিদের মধ্যে চারটে মজহাব – হানাফি, শাফি, মালিকী ও হাম্বলী। শুধু আত্মিক মুক্তির পথ নির্দেশই নয় সামাজিক অনুশাসনেও এরা ভিন্ন পথের দিশারী। সুন্নিদের মধ্যে এই চারটে ভাগের বাইরে রইলেন আহলে উবরাই উয়াল কিয়াস, গায়ের মুকাল্লিদ আহলে হাদীস ও ওহাবীরা। শিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে আছেন জাইদীয়, কাইসিনীয়, ইসনা আশারীয় এবং ইসমাইলীয়রা। ইসনা আশারীয়রা যুক্তিতে বিশ্বাসী এবং Transcendentalist। আকবরীরা পুরোহিত ও পীর শ্রেণীর মধ্যস্থতায়ই একমাত্র মুক্তি সম্ভব বলে মনে করেন। ইসমাইলীয়দের মধ্যে আছেন এ্যরিস্টটলপন্থী আবদুল্লাহ বিন মাইমুনের অনুসারীবৃন্দ, হামাদান সম্প্রদায় যাঁরা জন্মান্তরে বিশ্বাস করেন, হাসিমিন সম্প্রদায় এবং কারমেথীয়ানরা। এ ছাড়াও আছেন কাদেরীয়রা, বাতেন সম্প্রদায়, মুতাজিলীয় এবং শিয়া দলভুক্ত জায়েদ বিন জয়নালের মত মুক্তবুদ্ধির অনুসারীরা। আরো আছেন ক্যালভিনিস্টদের সাথে তুলনীয় জা’র পন্থী সম্প্রদায়ের জফম বিন সাফওয়ানের অনুসারীরা। এছাড়া সুফী সম্প্রদায় ত আছেনই যাঁদের প্রত্যেকেই এক একটি সম্প্রদায় এবং যাঁদেরকে – আল মাতারাদি, আল তাহাউই, আল বাকিল্লানী ও আল গাজ্জালী প্রভৃতি গোঁড়া সনাতনপন্থীরা সব সময়েই সন্দেহ এবং সতর্কতার চোখে দেখেছেন। এ সমস্ত সম্প্রদায় কি সবসময় শান্তিপূর্ন সহাবস্থান করেছেন? ইসলামের ইতিহাস এর উল্টা কথাই বলে। মুক্তির পথ বেছে নেয়ার উপায় কি? এমন কি ব্যক্তিগত মুক্তি? ধর্মীয় পরিমন্ডলে কি মুক্তবুদ্ধির চর্চা হয় না? সমস্ত ধর্মেই ঐতিহ্য, যুক্তিবিদ্যা, বিবেক, প্রথা, লোকন্যায় প্রভৃতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ইসলামেও ইসতিহ সান(opinion, জনমত), ইসতিসলাহ (public expediency), ইজতিহাদ (Legal Conclusion), ইজমা (Consensus), আকল (যুক্তি বা মুক্তবুদ্ধি), নজল (Revelation) প্রভৃতি নিয়ে তর্ক হয়েছে। মুক্তবুদ্ধির অনুসারী মুতাজিলীয়রা নিজেদেরকে ‘আহলুত তওয়াহীদ ওয়াল আদল’ অর্থাৎ ‘ঐক্য এবং ন্যায়ের অনুসারী’ বলে ঘোষনা করেছিলেন। বাতেনীয়রা কোরানকে রূপক হিসেবে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছিলেন। ওয়াহাবী-আজারিকা দের হাজ্জাজ বিন ইউসুফ দেশছাড়া করেন, মনসুর হাল্লাজ বা জায়েদ বিন জয়নাল ধর্মদ্রোহী বলে আখ্যাত হন, মুতাজিলাদের সমস্ত গ্রন্থ পুড়িয়ে ফেলা হয় এবং তাঁদের শুলে দেয়া হয়। ইবনে সিনা কারারুদ্ধ হন ও পরে দেশ ত্যাগ করে তাকে প্রাণ রক্ষা করতে হয়। ইবনে রুশদ প্রবীণ বয়েসে চাকরি ছেড়ে ছু’ড়ে প্রাণ রক্ষা করেন। ইসমাইলীয়রা ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করেন। আলামুত থেকে পালিয়ে আধুনিক আহলে হাদিস আন্দোলনের একজন প্রধান প্রবক্তা মীর আবদুল্লাহ গজনভী তাঁর মাতৃভূমি আফগানিস্তান থেকে বিতাড়িত হয়ে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ বৃটিশ ভারতে আশ্রয় পান। এ দিকে ভারতীয় মুসলমান আলেমরা পর্যায়ক্রমে স্যার সৈয়দ আহমদকে তাঁর যুক্তিপ্রবণ ইসলাম ব্যাখ্যার জন্য ‘নেচারী’ বা প্রকৃতিবাদী, ধর্মীয় পুনর্গঠনের প্রবক্তা ইকবাল, সাম্যবাদী নজরুল, যুক্তিবাদী আবুল হাসেম প্রভৃতি প্রতিভাবানকে ধর্মদ্রোহী কাফের আখ্যা দিয়ে চলেন।)}]

    অজ্ঞানতা প্রসুত অহংকার ও তাচ্ছিল্য একটা খুবই বাস্তব সমস্যা আমাদের বাংলাদেশে কোন আলোচনা করার ক্ষেত্রে। কিন্তু আমরা যদি আমাদের সমাজের সমস্যা মোকাবেলায় আলোচনা কে জরুরী মনে করি, তাহলে আলোচনার অর্থবহতার স্বার্থে প্রাসঙ্গিক ভাবে আলোচনা করাটা অধিকতর ভাল উপায়। আমার এই মন্তব্যে ইসলামের বাস্তবিক প্রয়োগের তাত্বিক ভিত্তিভূমির যে সংশয়টা অপ্রাসঙ্গিক ভাবে সামনে আনলাম সেটার মূল কারন – আগের মন্তব্যে “একমাত্র সঠিক” ইসলামের শরিয়াহ ও ফিকহ সম্পর্কে যে সুনিশ্চিত অবস্থান থেকে আলাপ করা হয়েছে সেটা সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত অনাস্থা জানানোর জরুরী ভেবেছি বলে। প্রত্যেক মন্তব্যকারীর ব্যাক্তিগত মত প্রকাশের স্বাধীনতার কৌশলগত ব্যবহার করলাম বলতে পারেন।

    নাসরীন সুলতানা মিতু, আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ শ্রেনীর প্রশ্নটিকে শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে সম্পর্কিত করে দেখানোর জন্য, সকল দিক দিয়ে মানবিকতা অর্জনের উপায় হিসেবে যতক্ষন আমরা শিক্ষাকে ব্যবহার করতে না পারব, ততক্ষন আমরা বিভেদের এই দেয়ালগুলি গড়তেই থাকব, বিভিন্ন মুখোশে oppressor & oppressed এর শ্রেণী তৈরি করতেই থাকব সমাজে। আজ তা বদলানোর সময় এসেছে। আশাকরি নতুন দিনের শিক্ষাব্যবস্থা আমরা শুরু করে যেতে পারব, যদি সমমনারা একসাথে কাজ করি তাহলে। শুভ কামনা এবং আমাদের শিকড়বিহীন শিক্ষাব্যবস্থার শেকড় গজানোর চেষ্টা নিয়ে আরো লেখা/আলোচনার প্রত্যাশা রইল। ভাল থাকবেন।

    • অনেক অনেক ধন্যবাদ সময় নিয়ে পড়ার জন্য। আপনার মন্তব্য থেকে আমি নিজেও অনেক কিছু জানলাম।

      ভাল থাকবেন।

  3. […] সাইটে প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে ‘একটি কুলীন শিক্ষাব্যবস্থা’ লেখাটি বিচারকের কাছে সেরা লেখা […]

  4. আমাদের অধিকাংশ শিক্ষদের প্রধান ডায়ালগ : এভাবে পড়লে কপালে পাশ জুটবে না । তাদের চিন্তাই পাশ করানো নিয়ে তাইলে সমাজ কে আলোর মুখ দেখাবে কারা?????????

    ধন্যবাদ।

  5. Peace be upon you!
    Very good writing.
    Subject is really number 1.
    Main problem of our nation.
    Thank you for thinking this way.
    But your writing reveals your knowledge about Religion is not Quran based, rather it’s situational and media based.
    Otherwise it would have been 100% perfect.

    But I like your writing very very much!

নাসরীন সুলতানা মিতু শীর্ষক প্রকাশনায় মন্তব্য করুন Cancel reply

Please enter your comment!
Please enter your name here