বাংলাদেশের শিক্ষা - ছোট
বাংলাদেশের শিক্ষা - ছোট


মুহম্মদ মাছূম বিল্লাহ: দেশের আনাচে-কানাচে গজিয়ে ওঠা বিভিন্ন ধরনের কোচিং সেন্টার আনুষ্ঠানিক শিক্ষাকে ধবংস করতে বসেছে। শুধু আনুষ্ঠানিক শিক্ষার বিকল্প নয় বরং আনুষ্ঠানিক শিক্ষার প্রতিদ্বন্দ্বিরূপে আবির্ভূত হয়েছে এই শিক্ষাদানরূপী বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে উঠেছে? নিশ্চয়ই সময়ের দাবিতে এবং সময়ের প্রয়োজনে। আমাদের আনুষ্ঠানিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন মেটাতে পারেনি এবং তাদরকে স্কুল ও কলেজের প্রতি আগ্রহী করতে পারেনি। তাই ছাত্রছাত্রীরা ভিড় জমাচ্ছে কোচিং সেন্টারগুলোতে। স্কুল-কলেজের ক্লাসরুম ফাঁকা অথচ ভিড় সব কোচিং সেন্টারগুলোতে। স্কুল-কলেজে ছাত্রছাত্রী রাখার জন্য বিভিন্ন ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে- শারিরীক ও অর্থনৈতিক শাস্তি। কিন্তু তারপরেও সন্তোষজনক উপস্থিতি নেই ক্লাসে।

দিন দিন প্রতিযোগিতা বেড়ে যাচ্ছে এবং এই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার মত যোগ্য করে গড়ে তোলার জন্য আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো ভুমিকা পালন করতে পারেনি বিধায় অভিভাবক এবং ছাত্রছছাত্রীরা কোচিংমুখী হয়েছে। ব্যতিক্রম ছাড়া কোচিংগুলোও তাদের সে প্রত্যাশা পুরণে সফল হয়েছে। আর তাই এই ব্যবসা ছড়িয়ে পড়েছে দেশের আনাচে-কানাচে। দিনে দিনে এর ভিত হয়েছে মজবুত এবং শক্ত। কারণ ছাড়া কোনো কিছুই হয় না। সময় এবং প্রয়োজন জন্ম দিয়েছে এইসব কোচিং সেন্টারের; কাজেই বৃহৎ কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়া হুট করে এই সেন্টারগুলো বন্ধ করে দেয়া যাবে না। আর তাই বন্ধ হচ্ছে না ।

কোচিং সেন্টারগুলোর সাথে যুক্ত হয়েছে অনেক বেকার তরুণ, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রছাত্রী এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষিকা। অনেকের রুটি-রোজগারের ব্যবস্থা হয় এখান থেকে, তবে রুটি-রোজগার যেন অবৈধ পন্থায় না হয় সেদিকেও আমাদের দৃষ্টি রাখতে হবে। কোচিং সেন্টারগুলো যদি স্কুল ও কলেজের বিকল্প হয়, তাহলে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কী ভুমিকা আছে? শুধু কি সার্টিফিকেট অর্জন করার মাধ্যম? আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে সেটি হচ্ছে, ছেলেমেয়েরা দিবসের বড় অংশ কাটায় স্কুল ও কলেজে। তারপর যদি আবারও কোচিং সেন্টারে গিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা সময় কাটাতে হয় স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, এত সময় তাদের কোথায়?

হুট করে বাস্তব কারণে গড়ে ওঠা কোচিং সেন্টারগুলো বন্ধ করে দেয়া যাবে না, কারণ কোচিং সেন্টারগুলো বাস্তব ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। কাজেই আমাদের দেখতে হবে কেন গজিয়ে উঠেছে এই সেন্টাগুলো এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যে বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতি চলছে সেগুলো বন্ধ হবে এবং শিক্ষার্থীরাও স্কুল ও কলেজমুখী হবে।

প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তিনটি টার্ম পরীক্ষা হবে। প্রতিটি টার্ম পরীক্ষার খাতা ইন্টার স্কুল এবং ইন্টার কলেজ শিক্ষকগণ পরীক্ষা করবেন। নিজস্ব স্কুল কিংবা কলেজের শিক্ষক কোনো খাতা মূল্যায়ন করবেন না। খাতা মূল্যায়ন করার জন্য শিক্ষকদের সম্মানী থাকবে। তাহলে তারা খাতাও ভালোভাবে দেখবেন এবং ছাত্রছাত্রীরা উপকৃত হবে। কারণ খাতা ভালোভাবে মূল্যায়ণ করে ছাত্রছাত্রীদের দেখানো উচিত যাতে তারা তাদের ভুলত্রুটি ধরতে পারে এবং শোধরাতে পারে- যে কাজটি এখন অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই হয় না। আর খাতা মূল্যায়ন ও প্রাইভেট প্রাকটিস দারুণভাবে প্রভাবিত করে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে, যে শিক্ষকগণ প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করেন, স্কুল ও কলেজের উক্ত শিক্ষকদের পেছনে পেছনে ছাত্রছাত্রীরা ভিড় জমায়।

একই স্কুলের বা কলেজের শিক্ষক প্রশ্নপত্রও প্রণয়ন করবেন না, অন্য স্কুল কলেজের শিক্ষক প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করবেন। প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করা এক ধরনের দক্ষতা, এই দক্ষতা সবার থাকে না। প্রশ্ন করে করে শিক্ষকদের এই দক্ষতা অর্জন করতে হয়। প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করার জন্য শিক্ষকদের যথাযথ সম্মানী থাকবে।

ইন্টারনাল পরীক্ষাগুলেতে এক স্কুল ও কলেজের শিক্ষকগণ অন্য স্কুল ও কলেজে পরীক্ষা গ্রহণ করতে যাবেন। তা হলে একদিকে যেমন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের মধ্যে আন্তরিকতা বৃদ্ধি পাবে এবং তাদের কর্মপরিধিও বৃদ্ধি পাবে। তাদের মন উদার হবে । পরীক্ষায় ডিউটি করার জন্য এবং আসা যাওয়ার সম্মানী পাবেন। এতে শিক্ষকদের মন উদার হবে এবং প্রাইভেট পড়ার প্রবণতাও কমে যাবে ।

নিজের স্কুল কিংবা কলেজের প্রশ্ন করলে কয়েক ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হয়। যে শিক্ষক প্রশ্নপত্র তৈরি করেন, দেখা যায় ছাত্রছাত্রীরা তার পেছনে ঘুরঘুর করে ঘুরতে থাকে, তার বাসায় দেখা যায় আরেকটি স্কুল কিংবা কলেজ । অনেক শিক্ষক আছেন তারা নীতি-নৈতিকতার মাথা খেয়ে ছাত্রছাত্রীদের প্রশ্নপত্র ফাঁস করে দেন। পরবর্তী পরীক্ষার পূর্বে দেখা যায় উক্ত টিচারের বাসায় আরও ছাত্রছাত্রীদের ভীড়। এই দৃশ্য এবং ঘটনা এখন ওপেন সিক্রেট। অথচ এর কোনো সুরাহা হচ্ছে না। এ ব্যাপারে দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কেউই কোনো কথা বলছেন না এই সেনসেটিভ বিষয়টি নিয়ে।

শিক্ষকদেররও অর্থের প্রয়োজন আছে। যুগ পাল্টেছে। এখন আর সেই সময় নেই যে শিক্ষকগণ বিনা পয়সায় ছ্ত্রাছাত্রীদের জ্ঞান দান করবেন। আবার এটিও ঠিক শিক্ষকগণ আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে পরিচিত হবেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেভাবে জ্ঞানের চর্চা হচ্ছে তার সাথে পরিচিত হবেন। কিন্তু শিক্ষকগণ প্রাইভেট পড়ানোটাকে এমনভাবে আকড়ে ধরেছেন যে, কোনোভাবেই তাদের আর তা করা হচ্ছে না। আর এই প্রাইভেট পড়াতে গিয়ে কোনো কোনো শিক্ষক কিছুটা অসততার আশ্রয়ও নিচ্ছেন। যারা নিচ্ছেন তাদের সংখ্যা খুব কম কিন্তু দোষটা পড়ছে পুরো শিক্ষক সমাজের উপর। আবার যারা করছেন না তারাও এই দোষে দুষ্ট হচ্ছেন। তার চেয়েও বড় কথা হলো, যে উদ্দেশ্যে পরীক্ষা নেয়া হয় পরীক্ষার সেই উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। এই অবস্থা আর চলতে দেয়া যায় না। এক স্কুল কিংবা কলেজের প্রশ্নপত্র অন্য স্কুল কিংবা কলেজের শিক্ষকগণ করলে ছাত্রছাত্রীদের অরিজিনালিটি যাচাই করা যায় এবং ছেলেমেয়েদের প্রাইভেট পড়তে বাধ্য করা হয় যে কারণে, সেটি আর তেমন গুরুত্ব পাবে না। কোন স্কুলের এবং কলেজের প্রশ্নপত্র কোন স্কুল কিংবা কলেজ করবেন, তা উক্ত স্কুল ও কলেজের প্রধানগণ সিদ্ধান্ত নিবেন। ব্যাপারটি সমন্বয় করবেন শিক্ষা বিভাগের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ কিংবা স্কুল ও কলেজ প্রধানগণ নিজেরাই। উপর্যুক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করার মাধ্যমে আমরা শিক্ষাক্ষেত্রে কিছুটা গুণগত পরিবর্তন আনতে পারি, ছাত্রছাত্রী এবং অভিভাবকদের কোচিঙের উপর নির্ভরশীলতা কমাতে পারি।

লেখক: উর্ধ্বতন ব্যবস্থাপক, ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচি, ঢাকা, বাংলাদেশ। ই-মেইল: mmbillah2000@yahoo.com

1 COMMENT

  1. বর্তমানে যে হারে কোচিং সেন্টারগুলো রাতারাতি গড়ে উঠতে তা এক হিসেবে উদ্বেগ জনক। আমাদের টাংগাইলে দেখা যায় পাড়ায় পাড়ায় রাস্তার মোড়ে মোড়ে কোচিং সেন্টার। টাংগাইলে যারা ভালো রেজাল্ট করে তারা কোন না কোন কোচিং সেন্টারের শিক্ষার্থী। কোচিং থেকে যদি শিক্ষার্থীরা এতো ভালো করে তবে কোচিংগুলোকে বিদ্যালয়ে রুপান্তর করা যায় কিনা তা নিয়ে ভাবতে হবে। কোচিংগুলোকে বিদ্যালয়ের কাঠামোতে আনা যায় কিনা তার বিষয়ে গবেষণা এখন সময়ের দাবি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here