বাংলাদেশের শিক্ষা - ছোট
বাংলাদেশের শিক্ষা - ছোট


রিদওয়ানুল মসরুর: বিংশ শতাব্দীতে ফিরে তাকালে দেখি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাশেই প্রাথমিক বিদ্যালয়। যদিও সেখানে বিদ্যালয় পরিকাঠামোয় কিছুটা ভিন্নতা দেখা যায়, তথাপিও পরিবেশ ও পরিকল্পনায় পরিকাঠামোগত সাযুজ্যই থাকত বেশি (সাবের ও যুহাইরুজ, ২০১১)। তখনকার দিনে সেটাই ছিল আদর্শ। সময়ের সাথে সাথে বদলায় আদর্শ এবং আদর্শিক ভাবনা। আজ তাই মাধ্যমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিকল্পনায় দেখি বিস্তর ফারাক। আবার কেউ কেউ, মানে কোনো কোনো শিক্ষাবিদ তো শিক্ষার্থীদের একেবারে গাছতলায় নিয়ে ক্লাস করাতে চান! না আমাদের দেশে নয়, এসব ভাবনা ইট-কাঠ-পাথরের দেশের। আমাদের দেশে শিক্ষার্থী-শিক্ষক-সরকার সবাই গরীব; আর কোন ব্যাপারে কেমন কী তা না জানলেও শিক্ষার ব্যাপারে আমাদের মিতব্যয়িতার কথা বোধকরি বেশ প্রসিদ্ধ। তাইতো সারা বিশ্ব এ খাতে আমাদের সাহায্য দিতে দিতে কাহিল। যাই হোক, আমাদের শিশুরা প্রকৃতির কোলেই শেখে, প্রকৃতির মাঝেই কাটে তাদের শৈশব-কৈশোর-যৌবন-বার্ধক্য। তবুও যারা বিদ্যালয়গুলোকে ধরে ধরে কংক্রিটের কাঠামো বানিয়ে রোবট তৈরির কারখানা বানাতে চাচ্ছেন, তাদের সেই প্রচেষ্টা যাতে পরিবেশকেন্দ্রিক ও পরিবেশবান্ধব হয়, সে লক্ষ্যে ভাবছেন অনেকেই।

চিত্র ১: জানালাগুলো পূর্ব পশ্চিম হলেই ভালো হয়; সেক্ষেত্রে সকাল ও বিকেলের রোদ পাওয়া যাবে। তবে মাথায় রাখতে হবে যেন অতিরিক্ত উত্তাপ না আসে (সূত্র: সাবের ও যুহাইরুজ ২০১১)
চিত্র ১: জানালাগুলো পূর্ব পশ্চিম হলেই ভালো হয়; সেক্ষেত্রে সকাল ও বিকেলের রোদ পাওয়া যাবে। তবে মাথায় রাখতে হবে যেন অতিরিক্ত উত্তাপ না আসে (সূত্র: সাবের ও যুহাইরুজ ২০১১)

শিক্ষক শিশুদের দ্বিতীয় পিতা আর বিদ্যালয় শিশুদের দ্বিতীয় বাড়ি- সেকথা আজ বহুল প্রচলিত। বিশ্বপ্রেক্ষিতে দেখি, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুরা বেশ অনেকটা সময় থাকে; একেবারে সকাল থেকে বিকেল। কিন্তু আমাদের দেশীয় প্রেক্ষাপটে তেমনটি নয়। তবুও কিছু মৌলিক বিষয় বিশেষ করে বিদ্যালয়ের কাঠামোগত বিষয়াদি সম্পর্কে আমাদের সচেতন থাকতে হবে যাতে কোমলমতি শিশুরা বিদ্যালয়ে এসে আকাঙ্ক্ষিত পরিবেশে নিরাপদে থাকতে পারে। একই সাথে স্থাপত্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ মনোবিদগণ বিদ্যালয় অবকাঠামোসমূহের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, স্থাপত্যরীতির সাথে শিশুর মনস্তাত্ত্বিক বিকাশের বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। বিদ্যালয় অবকাঠামো বিষয়ে কথা হলেই প্রথমেই যে কথাটি মাথায় আসে তা হলো আলো ও বাতাসের উপস্থিতি ও চলাচল নিয়ন্ত্রণ। সেজন্য পূর্ব-পশ্চিমে জানালাগুলো ছোট অথবা সংখ্যায় কম (চিত্র-১) হলেই ভালো হয়। তাতে সকাল ও বিকেলের রোদ পাওয়া যাবে। আবার বেশি রোদ এসে যেন আবহাওয়া কষ্টকর না হয়ে পড়ে তা মাথায় রাখতে হবে। বড় জানালাগুলো উত্তর-দক্ষিণ হলে বছরের সবসময়ই পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের সুযোগ থাকবে। কাঁচা বা আধা-পাকা বিদ্যালয় অবকাঠামোর ক্ষেত্রে জানালা ছাড়াও আলো-বাতাস ছাওনির ফাঁক দিয়ে চলাচল করে যা বিদ্যালয় অবকাঠামো পরিকল্পনার সময় খেয়াল রাখা দরকার। কাঁচা বা আধা-পাকা অবকাঠামোগুলোর চালা সাধারণত একদিকে বা উভয়দিকে ঢালু করা হয়। বিশেষ করে উপানুষ্ঠানিক বিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে তা অধিক প্রযোজ্য। এসব ক্ষেত্রে সাবের ও যুহাইরুজ (২০১১) চিত্র-২-এর নকশাকে আদর্শ বলে উল্লেখ করেছেন।

পাশাপাশি দিনের আলো নিয়ন্ত্রণের জন্য সম্পূরক কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। বিদ্যালয় পরিকল্পনার সময় মাথায় রাখতে হবে যে, বিদ্যালয় তৈরির উপকরণ থাকে শুরু করে, অবকাঠামোর নকশা ও নির্মাণে যেন শিশুদের পরিচিত উপকরণ ব্যবহার করা যায়। তাতে শিশুরা পরিচিত পরিবে

চিত্র ২: টিনের চালা ব্যবহারের ক্ষেত্রে চাল ঢালু করলে ভালো; আলো ও বাতাস চলাচলের পর্যাপ্ত সুযোগ থাকতে হবে (সূত্র: সাবের ও যুহাইরুজ ২০১১)
চিত্র ২: টিনের চালা ব্যবহারের ক্ষেত্রে চাল ঢালু করলে ভালো; আলো ও বাতাস চলাচলের পর্যাপ্ত সুযোগ থাকতে হবে (সূত্র: সাবের ও যুহাইরুজ ২০১১)

শে অধিক নিরাপদ বোধ করবে যার ফলে শিখন হবে অনেক বেশি কার্যকর। শিশুদের মনোজগতের কল্পনা আর পরিবেশগত প্রভাব মিলে সংগোপনে তৈরি করবে তার প্রয়োগযোগ্য সৃজনশীলতা।

আবার বিদ্যালয়ের শব্দ নিয়ন্ত্রণ করাটাও খুব জরুরি। শব্দদূষণ শিশুর মনোজগতে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। শিশুর ভবিষ্যৎ আচার-অভ্যাস নির্ধারণে এর প্রভাব সুগভীর। ইভান ও লেপোরে (১৯৯৩) সালের এক গবেষণায় দেখেন অধিক শব্দ শিশুর মনে রাখার ক্ষমতার ওপর ঋণাত্মক প্রভাব ফেলে। আবার সেচনিদার (২০০২) এক গবেষণায় দেখেন শিশুর অ্যাকাডেমিক অর্জনে শব্দমাত্রা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে ১২-১৪ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে শব্দমাত্রা দারুণভাবে প্রভাব বিস্তার করে থাকে (ব্যারেত ও ঝিয়াং, ২০০৯)।

আবার একীভূত শিক্ষানীতি, পরিপার্শ্বিক পরিবেশ ও স্থানীয় সংস্কৃতি ইত্যাদি যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে বিদ্যালয় পরিকল্পনা ও নকশা প্রণয়নে। তবে হুগটন ও সেইভেস্কি (২০০৯) মনে করেন, প্রাথমিক বিদ্যালয় অবকাঠামো পরিকল্পনায় আলো, শব্দ, তাপমাত্রা ও বায়ু চলাচল এই চারটি বিষয় বিবেচনা সবচেয়ে গুরুত্বের দাবি রাখে। প্রায় সব শিক্ষাবিদই মনে করে থাকেন, যথাযথ শিক্ষা উপযুক্ত উপায়ে পাওয়া সম্ভব কেবল প্রকৃতিঘেরা পরিবেশে। শিক্ষা পরিকল্পনাবিদরা বিশেষত বিদ্যালয় অবকাঠামো পরিকল্পনার সাথে যারা যুক্ত, তারা এ ব্যাপারে সচেতন হলেই সম্ভব আকাঙ্ক্ষিত মানসম্মত শিক্ষা।

নির্ঘণ্ট
Barrett, P. and Zhang, Y., 2009. “Optimal Learning Spaces Design Implications for Primary Schools”, SCRI Research Report Series, pp. 4-13.
Earthman, G.I., 2004. “Prioritization of 31 criteria for school building adequacy”, Baltimore,MD: American Civil Liberties Union Foundation of Maryland.
Egan, K., 1988. “Primary understanding: Education in early childhood”, Routledge New York.
Evans, G.W. and Lepore, S.J., 1993. “Non-auditory Effects”.
Houghton, J. and Syvitski, J.E.S.P., 2009. “Global warming: The complete briefing”,
Oceanography 22, pp. 270-278.
Saber, M. and Zuhairuse, M. D., 2011. Natural Elements in Primary School Design, European Journal of Social Sciences – Volume 24, Number 2, pp. 214-225
Schneider, M., 2002. “Do School Facilities Affect Academic Outcomes?”

রিদওয়ানুল মসরুর: শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Previous articleবিজ্ঞান শিক্ষা: পরিপ্রেক্ষিত বাংলাদেশ
পরবর্তী লেখাযৌনকর্মীর ছেলে-মেয়েদের শিক্ষার জন্য একটি স্কুল ও ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়া: ১
গৌতম রায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে শিক্ষায় স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে শিক্ষা-গবেষক হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেন ব্র্যাকের গবেষণা ও মূল্যায়ন বিভাগে। পরবর্তীতে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-এ যোগ দেন গবেষণা ও মূল্যায়ন সমন্বয়ক হিসেবে। সেখান থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে শিক্ষকতা পেশায় আসেন। তিনি আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ও পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট উভয় পর্যায়ে শিক্ষা-গবেষণার সাথে সম্পর্কিত কোর্সসমূহ যেমন—শিক্ষায় গবেষণা পদ্ধতি, শিক্ষায় মূল্যায়ন ও পরিমাপ, শিক্ষায় কর্মসহায়ক গবেষণা, শিক্ষা গবেষণায় পরিসংখ্যান ইত্যাদি কোর্সসমূহ পড়াচ্ছেন। পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষা বিষয়ে বিভিন্ন গবেষণার সাথেও যুক্ত রয়েছেন। গবেষক হিসেবে তিনি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা, শিক্ষায় মূল্যায়ন পদ্ধতি, শিক্ষা ও আইসিটি, কমিউনিটির সম্পৃক্ততা, শিক্ষায় প্রবেশগম্যতা, শিক্ষা প্রকল্প মূল্যায়ন ইত্যাদি বিষয়ে ৩০টিরও বেশি গবেষণা প্রজেক্টের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শিক্ষা-বিষয়ে তাঁর একাধিক গবেষণাভিত্তিক প্রবন্ধ বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে এবং একাধিক বই প্রকাশিত হয়েছে। শিক্ষা-বিষয়ে নিয়মিত লিখছেন বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও অনলাইন মিডিয়ায়। তিনি ‘বাংলাদেশের শিক্ষা’ ওয়েবসাইটের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

1 COMMENT

  1. খুব ভালো লাগলো লেখাটা। শ্রেণীকক্ষের অবকাঠামোগত স্থাপত্য বিষয়ক দিকগুলো নিয়ে দেশে লেখালেখি বলতে গেলে হয়ই নি। নতুন বিষয় নিয়ে লেখার জন্য ধন্যবাদ ভাইয়া। এরকম আরো লিখবেন বলে আশা রাখি। শিক্ষাবিদকে শিক্ষার সকল দিক নিয়েই ভাবতে হবে। এরকম একটা ধনাত্মক ধারণা পেয়ে খুব ভালো লাগছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here