ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল; ছবি কৃতজ্ঞতা: সুনামগঞ্জ বার্তা
ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল; ছবি কৃতজ্ঞতা: সুনামগঞ্জ বার্তা

আকতার বানু


বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় আমাদের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা যে কী সীমাহীন দুর্ভোগের মধ্যে আছেন, তা আমরা সবাই জানি। গত ১৯ মে, দৈনিক কালের কণ্ঠে প্রকাশিত “এই লেখাটি অভিভাবকদের জন্য” শিরোনামে ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবালের লেখাটি আমার ভীষণ ভালো লেগেছে। তাঁর সাথে কিছু বিষয়ে আমার আলাদা পর্যবেক্ষণ আছে। আমার বর্তমান লেখাটি সে প্রসঙ্গে।

স্যার, আপনি বলেছেন, অভিভাবকরা ছেলেমেয়েদের বিনোদন, খেলাধুলার সুযোগ না দিয়ে দিনরাত শুধু প্রাইভেট আর পড়ালেখা করতে বাধ্য করেন। যেকোনো মূল্যে এ প্লাস পাওয়া চাই। না পেলে সন্তানদের সাথে কোনো কোনো বাবা-মা খারাপ ব্যবহারও করেন। কথা সত্যি। তবে এটিও সত্যি যে, অভিভাবকরা শখ করে প্রাইভেট পড়ান না। তাঁরা নেহায়েত বাধ্য হয়ে সন্তানদের নিয়ে শিক্ষকদের দ্বারস্থ হচ্ছেন। ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার এই অতিরিক্ত চাপের জন্য শুধু অভিভাবকরা নন; সরকার, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষক, প্রশাসন সবাই দায়ী। বর্তমানে শিক্ষাব্যবস্থাকে আমরা এমন বানিয়ে ফেলেছি যে, প্রাইভেট না পড়িয়ে অভিভাবকদের কোনো উপায় নেই। যেমন, পিএসসি ও জেএসসি এ দুটো পাবলিক পরীক্ষা প্রবর্তনের ফলে পরীক্ষাগুলোর ফলাফলের গুরুত্ব শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছে বেড়ে যাওয়ার কারণে ভালো ফলের আশায় বাধ্য হয়ে অভিভাবকরা ছেলেমেয়েদের প্রাইভেট পড়াচ্ছেন।

তাছাড়া এখন ক্লাসের পড়ায় ছেলেমেয়েরা ভালো করতে পারছে না। শিক্ষকরা ইচ্ছে করে ক্লাসে ঠিকমত পড়ান না। পড়ালে শিক্ষার্থীরা তাদের কাছে প্রাইভেট পড়বে না। ঠিকমত না পড়ানোর কারণে শিক্ষার্থীরা পড়া বোঝে না, রেজাল্ট খারাপ করে। তাই তারা বাধ্য হয়ে প্রাইভেট পড়ে। পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের সাথে শিক্ষকরা ও কোচিং সেন্টারগুলো জড়িত। তাই প্রশ্ন পেয়ে ভালো ফল করার আশায় অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা প্রাইভেটের পিছনে ছুটতে বাধ্য হচ্ছেন। প্র্যাকটিকালের পুরো নম্বর শিক্ষকদের হাতে। ফলে শিক্ষকরা প্রাইভেট পড়তে বাধ্য করতে পারেন—একথা আপনিও বলেছেন।

বর্তমানে বাংলাদেশে মূলত শিক্ষকদের সীমাহীন লোভের কারণে কোচিং ব্যবসার লাগামহীন প্রসার ঘটেছে গোটা দেশে। শহর তো বটেই, গ্রামের বিদ্যালয়গুলোতেও প্রাইভেট ব্যবসা জমজমাট। শিক্ষকরূপী এসব কোচিং ব্যবসায়ীর হাতে জিম্মি সব শ্রেণি-পেশার শিক্ষার্থী-অভিভাবক। আগে কোনো শিক্ষার্থী প্রাইভেট না পড়লে শিক্ষকরা তাকে বাধ্য করতেন না। এখন শিক্ষকরা প্রাইভেটে শিক্ষার্থী আনার জন্য নম্বর কম দেয়া, শিক্ষার্থীদের মারা, ইচ্ছে করে কঠিন প্রশ্ন করা, যারা প্রাইভেট পড়ে তাদেরকে পরীক্ষার আগে প্রশ্ন আউট করে দেয়া, তাদেরকে নম্বর বেশি দেয়া এবং যারা পড়ে না, তাদেরকে কম নম্বর দেয়া, অভিভাবকদেরকে নানাভাবে চাপ দেয়া ইত্যাদি নানা কূটকৌশল অবলম্বন করেন। এ কারণে অভিভাবকরা প্রাইভেট পড়াতে বাধ্য হন।

এখন প্রতিযোগিতায় টিকতে হলে ভালো ফল করতেই হবে। যার জন্য প্রাইভেটও বেশি না পড়ে উপায় নেই। তাই ভালো বিদ্যালয়ে, ভালো কোচিঙে ভালো শিক্ষকের কাছে পড়াটা জরুরি। অনেকের কাছে এটি মানসিক তৃপ্তি ও ভরসার কারণও। তাছাড়া বিত্তবানরা পড়ানোর জন্য টাকা খরচ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেন না। তাই শিক্ষকরাও লোভী হয় বাড়তি আয়ের জন্য। এ-কারণে তুলনামূলকভাবে অস্বচ্ছল অভিভাবকরাও বাধ্য হচ্ছেন শিক্ষকদের লোভের খোরাক জোগাতে।

বাংলাদেশের ভালো বিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি পরীক্ষা না দিয়ে কোনো শিশু ভর্তি হতে পারে না। অর্থাৎ বিদ্যালয়ে আসার আগেই শিশুকে অনেক কিছু শিখে আসতে হয়, যা তাঁর বিদ্যালয়ে আসার পরে শেখার কথা। একারণে শিশুদের উপরেও থাকে পড়ার ভীষণ চাপ। এখন যেভাবেই হোক, শেখার চেয়ে ভালো নম্বর পাওয়াটা বেশি জরুরি। কেননা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ নম্বর না পেলে ভর্তি পরীক্ষা দেয়ার সুযোগই দেয়া হয় না। এখন তো আবার ভালো নম্বর পেলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে একবারের বেশি ভর্তি পরীক্ষা দিতে দেয়া হয় না। আগে দ্বিতীয় বিভাগ পাওয়া শিক্ষার্থীও বুয়েটে চান্স পেয়েছে যা এখন অসম্ভব।

সৃজনশীল পদ্ধতি না বোঝার কারণে এখনকার শিশুরা সব বিষয়ে প্রাইভেট পড়ে। ধর্ম, সমাজ, এমনকি মাতৃভাষা বাংলাও। ক্লাসের প্রথম যে শিক্ষার্থী, সে সবচেয়ে বেশি প্রাইভেট পড়ে। অর্থাৎ ফলাফলের কৃতিত্ব শিক্ষার্থীর নয়, প্রাইভেটের। আগে অভিভাবকেরাই নিজের ছেলেমেয়েদের পড়াতেন। সৃজনশীল পদ্ধতি চালু হওয়াতে অভিভাবকরা তা না বোঝার কারণে আর তা পারেন না। এই সুযোগটিই নিচ্ছে আমাদের শেয়াল পণ্ডিতরা। তাছাড়া এখন শিক্ষার্থীদের মূল বইয়ের বাইরেও মোটা মোটা গাদা গাদা গাইড বই পড়তে হয়। এত বই শুধু রিডিং পড়তে হলেও কী পরিমাণ সময় দরকার তা অনুমান করা যায়।

জোর করে শতভাগ পাসের হার ও এ-প্লাস বাড়ানোর সরকারি চাপের ফলে প্রচুর ছেলেমেয়ে পাস করছে, কিন্তু এদের ভর্তি করানোর জন্য কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পর্যাপ্ত আসন নেই। তাই পাস করে ভর্তির নিশ্চয়তাও নেই। ফলে পাস করে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি পরীক্ষার তীব্র প্রতিযোগিতায় টেকার জন্য আবার শিক্ষার্থীদের কোচিং করাতে বাধ্য হন অভিভাবকরা। এখন বাবা-মা ব্যস্ততার কারণে সন্তানদের পড়াশোনার পিছনে সময় দিতে পারেন না। এখন প্রশ্নের ধরন এমন যে, গাইড বই না পড়লে পড়ানো যায় না। অভিভাবকদের অত মোটা মোটা গাইড বই পড়ে সন্তানদের পড়ানোর বিড়ম্বনার চেয়ে কোচিঙে দেয়া বেশি সহজ। তাছাড়া প্রাইভেট না পড়লে ফল খারাপ করবে, অভিভাবকরা এ ঝুঁকি নিতে চান না।

আমাদের দেশে ছাত্র-ছাত্রী ফেল করলে বা খারাপ করলে শিক্ষকদের কোনো জবাবদিহিতা নেই বা শাস্তি ও হয় না। ফলে শিক্ষকরা বিদ্যালয়ে কম, কোচিং বা প্রাইভেটে বেশি পড়ান। ইচ্ছে করে ক্লাসে শিক্ষার্থীদের ভালো করে পড়ান না বা ফল খারাপ করান যাতে শিক্ষার্থীরা প্রাইভেট পড়তে আসে বা অভিভাবকরা পড়তে পাঠান।
প্রশ্ন ফাঁসের ফলে এখন ভালো ফলাফলের নিশ্চয়তা নেই। এটি অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম হতাশা তৈরি করে। সেই সাথে যেকোনো মূল্যে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন জোগাড় করে হলেও ভালো ফল করার তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। এটি শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের নৈতিক স্খলনের জন্য দায়ী। এজন্য মূলত দায়ী রাষ্ট্রের ব্যর্থতা। আগে আমরা প্রশ্ন ফাঁসের কথা শুনিইনি। কিন্তু এখন ফাঁস না হওয়াটাই অবিশ্বাস্য। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার কারণে অভিভাবকদের দিনরাত সন্তানদের নিয়ে প্রাইভেটের পিছনে ছুটতে গিয়ে আর্থিক ক্ষতি, শারীরিক, মানসিক কষ্ট পোহাতে হয়। সন্তানদের পড়ার কারণে অভিভাবকরা বেড়াতেও পারেন না।

৪ এপ্রিল ২০১৭-এর দৈনিক যুগান্তরের প্রতিবেদনে দেখলাম, বিদ্যালয়ে ও প্রাইভেটে পড়ার করণে তৃতীয় শ্রেণির একজন শিক্ষার্থীকে রোজ গড়ে ১২/১৩ ঘণ্টা এবং এসএসসি-এইচএসসির শিক্ষার্থীকে গড়ে ১৫/১৬ ঘণ্টা পড়তে হয় বিদ্যালয়-কোচিং-বাসা—সব মিলিয়ে। এবার ভাবুন, এত বেশি পড়ার চাপ সহ্য করতে হলে ছেলেমেয়েদের মানসিক অবস্থা কেমন হওয়ার কথা। তারা খেলার, বিনোদনের সুযোগ পায় না। ফলে তাদের বিকাশ বিঘ্নিত হচ্ছে। আগে বার্ষিক পরীক্ষার পর ছেলেমেয়েরা বেড়াতে যেত, গল্পের বই পড়ত, খেলত, শখ করে কোনোকিছু শিখত। তাতে তাদের মানসিক, সামাজিক, আবেগিক বিকাশ হত। এখন পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরের দিন থেকেই ছেলেমেয়েরা প্রাইভেট পড়ে। ফলে শিক্ষার্থী, অভিভাবক কেউই বেড়ানোর সময় পান না।

এখন শিক্ষার্থীরা পড়া, কোচিং, গাইড বই, ভর্তি পরীক্ষার চাপে মানবিক বোধ হারিয়ে ফেলছে। অনেক শিক্ষার্থী ভালো ফলাফল করতে না পেরে আত্মহত্যা করে প্রতিটা পাবলিক পরীক্ষার পর, যা আপনি উল্লেখ করেছেন। ভালো ফলাফলের নিশ্চয়তা নেই প্রশ্ন ফাঁসের কারণে। চাকরির নিশ্চয়তাও কম নানা দুর্নীতি আর প্রশ্ন ফাঁসের কারণে। আমাদের ছেলেমেয়েরা বড় হচ্ছে হতাশা নিয়ে। তাদের সামনে কোনো স্বপ্ন নেই, চাকরির নিশ্চয়তা নেই, উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সম্ভাবনাও নেই। তারা কিছু রুঢ় বাস্তবতা জেনেই বড় হচ্ছে। বিদ্যালয়, কলেজ পড়ুয়া ছেলেমেয়েরা জানে, ভালো ফল করেও সিট স্বল্পতার কারণে ভালো কোন কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়া কতটা কঠিন। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলেমেয়েরা জানে, একটা ভালো চাকরি পাওয়া এদেশে কতটা দুষ্প্রাপ্য। কত রকমের প্রতিকূলতা তাদের সামনে অপেক্ষা করছে। তারা জানে, রাষ্ট্র, সমাজ তাদের জন্য কেমন ভবিষ্যত তৈরি করে রেখেছে। তারা জানে, জাতির বিবেক শিক্ষকরা কোচিং ব্যবসায়ী; সমাজে দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর, সুবিধাবাদী, অসৎ লোকে ভরা। তারা জানে, এমন অনাচারে ভরা সমাজে একবুক আশা নিয়ে ছেলেমেয়েদের সুদিন দেখার অপেক্ষায় থাকা অভিভাবকদের প্রত্যাশা পূরণ করা কতটা কষ্টকর। আর এজন্য আমাদের মানসিকতাও অনেকটা দায়ী। সবাইকেই ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিসিএস ক্যাডার হতেই হবে। কারণ অন্য কিছু করেও যে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়া যায়, এমন ধারণা বা ওরকম পেশার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নেই।

পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে বিদ্যালয়ে শিশু ভর্তি নেয় ভর্তি পরীক্ষা ছাড়া। তিন/সাড়ে তিন বছর বয়সে বাড়ির কাছের কিন্ডারগার্টেনে শিশুকে ভর্তি করালেই বাবা-মার দায়িত্ব শেষ। তারা মেধানুযায়ী উপরের ক্লাসে উঠতে থাকবে। ছয় বছরে যাবে প্রাথমিক স্কুলে। মেধা অনুযায়ী কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাবে। মেধা অনুযায়ী বৃত্তি ও পাঠ্যবিষয় পাবে। শিশু যে বিষয়ে সবচেয়ে বেশি পারদর্শী বা সবার চেয়ে ভালো করে, তাকে সেই বিষয়েই পড়তে দেয়া হয়। তার বিভিন্ন বিষয়ে প্রাপ্ত ধারাবাহিক স্কোর দেখে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বলে দেয় শিশু ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আর্টিস্ট, ব্যাংকার নাকি গায়ক হতে পারবে। বাবা-মা শিক্ষকদের পরামর্শের ভিত্তিতে ঠিক করেন শিশু কী পড়বে। অর্থাৎ ওসব দেশে ছেলেমেয়েরা যোগ্যতা থাকলে নিজের ইচ্ছামত যা খুশি পড়তে পারে, যা খুশি হতে পারে। তার ফলাফল দেখে বিদ্যালয় তার মেধার জন্য সবচেয়ে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিষয় জানিয়ে দেয়। আমাদের মত বাবা-মায়ের ইচ্ছা বা চাপে বা পছন্দের বিষয়ে সুযোগ না পেয়ে বাধ্য হয়ে কেউ অপছন্দের বিষয় পড়ে না। কোথাও ভর্তি হবার জন্য শিক্ষার্থীকে কোচিং সেন্টারে বা বাসায় প্রাইভেট পড়তে বা ভর্তি পরীক্ষা দিতে হয় না।
পশ্চিমা দেশগুলোতে আধুনিক শিক্ষা উপকরণসমৃদ্ধ সুসজ্জিত বিদ্যালয়তে ক্লাসের পড়া ক্লাসেই করানো হয়। বাড়ির কাজ দেয়া হয়; তবে অভিভাবকদের কঠোরভাবে নিষেধ করা থাকে, যেন তারা শিক্ষার্থীদের বাড়ির কাজ করে না দেন। শিশু নিজে নিজে চেষ্টা করে শিখুক। তাতে ওরা স্বাবলম্বী হবে, আত্মবিশ্বাস বাড়বে, লেখাপড়ায় তথা নিজের কৃতিত্ব বা সাফল্যে আনন্দ পাবে। শিশু পড়া করতে না পারলে শিক্ষক করাবেন। তবে হ্যাঁ, যে সমস্যার সমাধান শিশু পারছে না, তার কাছাকাছি কোনো সমস্যা তৈরি করে সেটার সমাধান করে দেয়া যেতে পারে। শিক্ষার্থী কোনো বিষয় না বুঝলে শিক্ষক সেটি বুঝিয়ে দিতে বাধ্য। দুর্বল শিক্ষার্থীদের প্রতি শিক্ষককে অতিরিক্ত যত্ন নিতে হয়। প্রয়োজনে ক্লাসের বাইরে অবসর সময়ে শিক্ষার্থীদের বিনা পয়সায় পড়াতে হয়। কারণ কোনো শিক্ষকের ক্লাসে ছেলেমেয়ে ফেল করলে পরের বছর তাঁকে ক্লাস দেয়া হয় না। এসব দেশের ছেলেমেয়েদেরকে শিক্ষার কোনো স্তরেই প্রাইভেট পড়তে হয় না, বাবা-মাকে বাসায় বা কোচিং সেন্টারে বাচ্চাকে পড়তে দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতেও হয় না। বর্তমানে বাংলাদেশে পিএসসি-জেএসসি পরীক্ষা, সৃজনশীল পদ্ধতি চালু, শিক্ষকদের লোভ এবং বিভিন্ন ভর্তি পরীক্ষা—এসব কারণে কোচিং ব্যবসার লাগামহীন প্রসার ঘটেছে গোটা।

উন্নত দেশগুলোতে লেখাপড়ার ধরন পাল্টে যাচ্ছে। তারা শিশুদের কফি শপ দিয়ে বলে, আগামী এক বছর এ দোকানটি চালানো তোমার পরীক্ষা। দোকান চালাতে গিয়ে তারা হাতেনাতে অংক শিখেছে, কফি বিক্রি করতে গিয়ে মার্কেটিং শিখেছে, পুরো ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে ম্যানেজমেন্ট শিখেছে, লাভ-লসে পড়ে অর্থনীতি শিখেছে। যেসব ছেলেমেয়ে মেকানিকাল কাজ জানে, তাদের দেয়া হয় গ্যারেজ বা কোনো খুচরা যন্ত্রাংশের দোকান, কাউকে দেয়া হয় কাপড়ের বা সৌখিন জিনিসের দোকান, কাউকে দেয়া হয় যন্ত্র বানানো বা কম্পিউটার প্রোগ্রামিং-এর কাজ। যে যার দক্ষতা দিয়ে দোকান চালাবে বা কাজ করবে। প্রত্যেকের পারদর্শিতার ভিত্তিতে নম্বর দেয়া হবে। এতে তার অ্যাকাডেমিক শিক্ষার সাথে সাথে ভবিষ্যত কর্মজীবনের দিকনির্দেশনাও পাওয়া হয়ে যায়।

শিশুদের যাতে বিদ্যালয় ও পড়াভীতি তৈরি না হয় সেজন্য প্রথম ছয় বছর খেলাধুলা, ছবি আঁকা, গল্প করা, নাচ, গান এসব করানো হয় উন্নত দেশগুলোতে। পরীক্ষাভীতি শিশুদের শেখার আগ্রহ নষ্ট করে। তাই ফিনল্যান্ডে স্কুলে যাবার পর প্রথম ছয় বছর কোনো পরীক্ষা হয় না। ১০ বছর পর শিশুরা প্রথম বড় ধরনের পরীক্ষা দেয়। আর আমরা পাবলিক পরীক্ষা বাড়াই। সামগ্রিকভাবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় যে ধ্বস নেমেছে সেটি রদ করতে হলে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে।

Previous articleদেশময় প্রাথমিক শিক্ষা
পরবর্তী লেখাশিক্ষক যখন যৌননির্যাতনকারী
ড. আকতার বানু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইআর)-এর একজন সহযোগী অধ্যাপক। তিনি এসএসসিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল থেকে রাজশাহী বোর্ডে মানবিক বিভাগ থেকে মেয়েদের মধ্যে প্রথম ও সম্মিলিত মেধা তালিকায় অষ্টম স্থান এবং এইচএসসিতে রাজশাহী কলেজ থেকে রাজশাহী বোর্ডের মানবিক বিভাগ থেকে মেয়েদের মধ্যে প্রথম ও সম্মিলিত মেধা তালিকায় তৃতীয় স্থান অধিকার করেন। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোবিজ্ঞানে অনার্স ও মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানে পিএইচডি করেছেন। তিনি বর্তমানে শিক্ষা মনোবিজ্ঞানে পাঠদান, লেখালেখি, নানা গবেষণামূলক কাজ ও কাউন্সেলিং করছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here