সবার জন্য শিক্ষা
সবার জন্য শিক্ষা

আবু সিদ


বছরকয় আগে দেশের বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল আমার। উদ্দেশ্য ছিল বিদ্যালয়গুলো থেকে কিছু তথ্য সংগ্রহ করা। পাশাপাশি যদি ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সাথে কুশল বিনিময় ছাড়াও কিছু কথা বলা যায়!

এপ্রিল মাসের এক সকালে রওনা হলাম দেশের এক প্রত্যন্ত স্কুলের উদ্দেশ্যে। সেখানে পৌঁছতে আমাদের দেরিই হল। জেলা শহর থেকে গিয়ে সেখানে পৌঁছলাম বেলা ১১টায়। পৌঁছে দেখি ছাত্রছাত্রীরা সব দৌড়াদৌড়ি ছুটোছুটি করছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেল যে কোনো শিক্ষক তখনও এসে পৌঁছাননি ।

একদল অজানা-অচেনা লোক বিদ্যালয়ের আঙিনায় ঘোরাঘুরি করছে! খবরটা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল। কিছুক্ষণের মধ্যে ছুটতে ছুটতে একজন শিক্ষক এসে পড়লেন। তাঁকে দেখে ছাত্রছাত্রীরা খেলা থামিয়ে দিলো। আস্তে আস্তে তারা ক্লাসে ঢুকে পড়ল। শিক্ষার্ত্রীদের সবাইকে ক্লাসে বসিয়ে তিনি আমাদের বসালেন অফিসে। আমরা বসতে বসতে কিছু নাস্তাপানিও এসে গেল। এর মধ্যে ছেলেমেয়েদের কথাবার্তা চিৎকার-চেঁচামেচি হয়ে ছড়িয়ে পড়ল বাতাসে। আবার ছুটলেন তিনি। কিছুক্ষণ বাদে আবার ফিরলেন। ‘বোঝেন তো, একা তিন ক্লাস সামলানো! তা আপনারা দূর থিকা আচ্চেন; একটু নাস্তাপানি করেন!’

তাঁর সাথে কথা বলতে বলতে প্রধান শিক্ষক এসে গেলেন। তিনি বয়স্ক মানুষ। মাথার সামনের দিকটা ফাঁকা। যতটুকু চুল আছে তার বেশির ভাগ পাকা। আমাদের সাথে কথাপ্রসঙ্গে বললেন, একটু অন্য কাজে ব্যস্ত; তাই আজ দেরি হইল। আমাদের আরেকজন শিক্ষক অসুস্থ।

বিদ্যালয়ের আশেপাশের মানুষজনের সাথে কথা বলে জানা গেল অন্য ঘটনা। বিদ্যালয়ে আছেন তিন জন শিক্ষক। প্রত্যেক শিক্ষক দুই দিন করে বিদ্যালয়ে আসেন। এই দুই দিন তিনিই সামলান সব ক্লাস। একজন মানুষ একা কীভাবে এতোগুলো ক্লাসে পাঠদান করেন তা ভাবনার বিষয়।

খোঁজখবর করে জানা গেল, প্রধান শিক্ষকের আড়ত আছে। তিনি সেখানেই বসেন; বিদ্যালয়ে আসার সময় তাঁর কোথায়? অন্য শিক্ষকরাও তাদের জমিজমা বা অন্য পারিবারিক কাজে ব্যস্ত থাকেন। এর মধ্যে প্রতি সপ্তায় দু’দিন সময় তাঁরা বের করে নেন বিদ্যালয়ের জন্য!

এ হল এক ধরনের বাস্তবতা। আবার এমন বিদ্যালয়ও আছে যেখানে শিক্ষক মহোদয় নিয়োগ দিয়ে রেখেছেন মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক পাশ করা কোনো তরুণ বা তরুণীকে। তাঁরাই সামলান শিক্ষকের দায়িত্ব।

স্টারমশাই মাসে দুয়েকদিন কিংবা কয়েক দিন বিদ্যালয়ে আসেন। ঠিক সময়ে বেতন তুলে নেন, আর তার থেকে কয়েক হাজার তাঁর কাজ সামলানো সেই তরুণ/তরুণীকে দেন।

আবার অনেক বিদ্যালয় আছে যেগুলো চালু হয়েছিল পারিবারিক উদ্যোগে। হয়তো ভাইবোন বা অন্য আত্মীয়স্বজন মিলে সেগুলো শুরু করেছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে হাজার হাজার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারিকরনের জোয়ারে সেগুলোও সরকারি বিদ্যালয়ের মর্যাদা লাভ করেছে। কিন্তু সেখানে শিক্ষার গুণ-মান নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। এসব বিদ্যালয় ও সেখানকার ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষার অবস্থা যথেষ্ট খারাপ। উপরন্তু, এসবের জন্য কার্যকর কোনো তদারকির ব্যবস্থাও নেই।

শিক্ষকদের কাজ তদারকির জন্য শিক্ষা অফিসাররা আছেন। কিন্তু তাঁদের বেশিরভাগ আর কষ্ট করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে আসতে চান না। কার্যকর তদারকি বা প্রাথমিক শিক্ষার মান তাই আগের থেকে নিচে নেমে গেছে বলে অনেকে আশঙ্কা করছেন! এসবের কারণ খুঁজে বের করা খুব প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে। এটি জানা জরুরি যে রাজধানী বা বিভাগীয় শহর এমনকি জেলা শহরেও কেন লেখাপড়া জানা মা-বাবারা তাদের সন্তানদের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠাচ্ছেন না।

অন্যদিকে তদারকি না থাকলেও কিছু বিদ্যালয় আছে দূর গ্রামেও যেখানে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের আন্তরিকতা ও পাঠদান প্রশংসনীয়। সেসব বিদ্যালয়ে ঢুকলেই বোঝা যায় যে, সেখানে কার্যকর পাঠদান চলছে।

পঠন–পাঠন ছাড়াও বিদ্যালয়ের সার্বিক পরিবেশ-পরিস্থিতিও খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। যেমন, অনেক বিদ্যালয়ে খাদ্য কর্মসূচি চলছে। সেসব বিদ্যালয়ের চারদিকে শত শত বিস্কুটের প্যাকেট ঘুরে বা উড়ে বেড়াচ্ছে গাছের পাতার মতো। পয়ঃনিষ্কাশনের অবস্থা আরও খারাপ। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন তহবিলের কিছু প্রকল্পের মাধ্যমে কোনো কোনো বিদ্যালয়ে স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এর বাইরে অধিকাংশ বিদ্যালয়ে টয়লেট বা হাত-মুখ ধোয়ার ব্যবস্থা খুব করুণ।

আবার এই ডিজিটাল যুগের কালে সরকার প্রত্যেক উপজেলায় অন্তত একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এর জন্য বিদ্যালয়ে ল্যাপটপ দেয়া হয়েছে, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। তবে বাস্তবতা আশানুরুপ নয়। মাল্টিমিডিয়া ব্যবহার করে ক্লাসে পাঠদান এক বিরল ঘটনা।
হয়তো ল্যাপটপটা প্রধান শিক্ষককের বাড়ির নিরাপদতম আলমারিতে ঘুমাতে ঘুমাতে মৃত্যুবরণ করেছে। হয়তো কোনো শিক্ষক নিজের কাজেই সেটা ব্যবহার করছেন। তবু ভালো যে জনগণের ট্যাক্সের টাকা কিছুটা হলেও কাজে লাগলো! নেহাত অকেজো হয়ে কোনো আলমারিতে বসে অক্কা পেল না। এসবের বাইরে আবার হয়তো কোনো ‘দূরদৃষ্টিধারী’ কেউ ভাবছেন, এসব বাংলাদেশে হবে-টবে না! তবে কিছু কিছু বিদ্যালয় আছে যেখানে শিক্ষার্থীরা ভয়ে ভয়ে হলেও ল্যাপটপের অতি ‘কমনীয়’ শরীরে আঙ্গুল ছোঁয়াতে পারে।

অনেক সমালোচক বলেন, আমাদের বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের পাশের হার বাড়াবাড়ি রকম বেড়ে গেছে। সেই তুলনায় শিক্ষার মান পড়ে গেছে সাংঘাতিক রকম। সামান্য অঙ্ক বা সাধারণ জ্ঞানে তারা ব্যর্থ। কয়েক লাইন বাংলা বা ইংরেজি শুদ্ধ করে লেখাও তাদের সাধ্যের বাইরে।

এই যখন শিক্ষার গুণগত মান, তখন বিদ্যালয়ে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ যথেষ্ট ঝামেলার। কোনো কোনো বিদ্যালয় থেকে বলা হয়, না, কোনো তথ্য তো আপনাদের দেয়া যাবে না! প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের চিঠি দেখালে তাঁরা বলেন, শিক্ষা অফিসার স্যার না বলা পর্যন্ত আমার বিদ্যালয়ে ঢুকতে পারবেন না। শিক্ষা অফিসার মহোদয় হয়তো লিখে দিলেন যে তথ্য দেয়া যেতে পারে। শিক্ষকদের তাতেও আপত্তি আছে—“স্যার ফোন দিয়া কইলে তয় দেক্‌মুয়ানে”!

প্রাথমিক শিক্ষার প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে এটি বললে বেমানান হবে না যে, দেশের মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক বা উচ্চশিক্ষাও কিন্তু প্রশংসনীয় অবস্থানে নেই। সর্বত্রই মানহীনতার ছড়াছড়ি। এই মানহীনতার ব্যাপকতা বা গভীরতা আমাদের এখনো অজানা। কারণ আমাদের দোষত্রুটি, সীমাবদ্ধতা নিয়ে কথা বলতে আমরা ভীত। না জানি এতে আমার দোষটাই বেরিয়ে পড়ে! আমার ঘাড়েই দোষ চাপে! তবে আমরা ভেবে দেখতে পারি যে, অন্য দেশ, অন্য জাতি আর অন্য মানুষ যদি মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারে, তবে তা আমাদেরও পারার কথা।

2 COMMENTS

  1. আবু সিদ ভাই, ধন্যবাদ! চমৎকার একটা লেখা উপহার দেয়ার জন্য। ভাবনা জাগানিয়া লেখা। আমাদের শিক্ষক সমাজ ও বিশিষ্ট নীতি-নির্ধারকদের বোধদয়ের আপক্ষায়…। আমাদের সার্বিক শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়নের জন্য তীব্র একটা সংশোধনী অভিযান প্রয়োজন। আপনার সাবলীল লেখার জন্য অ-নে-ক অনুপ্রেরণা, লেখা চালিয়ে যান।

    • প্রিয় মোয়াজ্জেম ভাই, আপনাকেও ধন্যবাদ গোছানো মন্তব্যের জন্য। ভালো থাকবেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here