বাংলাদেশের শিক্ষা - ছোট
বাংলাদেশের শিক্ষা - ছোট


গৌতম রায়: আগের দুটো পর্ব আমরা পার করেছি মূলত ফাঁকিবাজি করে। চলুন এ পর্ব থেকে শুরু করি কাজের আলোচনাগুলো। শিক্ষা কিংবা সামাজিক বিজ্ঞানে গবেষণাকে দুটো ভাগে ভাগ করা যায়- গুণগত (qualitative) এবং পরিমাণগত (quantitative)। গবেষকদের একদলকে শুধু গুণগত গবেষণাকে প্রাধান্য দিতে দেখা যায়, অপরদিকে আরেকদল প্রাধান্য দেন পরিমাণগত গবেষণাকে। মাঝখানে আরেকটি দল আছে যারা দুটোকেই মিশিয়ে গবেষণার পদ্ধতি নির্ধারণ করেন। গুণগত গবেষণা এবং পরিমাণগত গবেষণা নিয়ে নানা সময়ে নানা ধরনের বিতর্কও শোনা যায়- যদিও এসব বিতর্ক এক অর্থে অর্থহীন; কারণ দুটো পদ্ধতিরই সুবিধা-অসুবিধা রয়েছে, শক্তিশালী ও দুর্বল দিক রয়েছে। তবে গবেষণার উদ্দেশ্য অনুসারে একটি নির্দিষ্ট গবেষণার জন্য কোন পদ্ধতি সবচেয়ে উপযুক্ত, সেই বিষয়ে এবং ওই নির্দিষ্ট গবেষণার প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে বিতর্ক করা যেতে পারে।

পরিমাণগত গবেষণা কেন? গুণগত গবেষণার সাথে এর পার্থক্য কোথায়?
যখন আমরা কোনো একটি নির্দিষ্ট গবেষণার বিষয়ে চিন্তাভাবনার প্রাথমিক কাজগুলো করি, তখনই মূলত সিদ্ধান্ত নিতে হয় এই গবেষণা থেকে ঠিক আমরা কী বের করতে চাই। উদাহরণস্বরূপ, গবেষণা থেকে নিচের বিষয়গুলো বের করা যেতে পারে:

ক. বাংলাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীর অনুপাত কত?
খ. প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সাথে শিক্ষার্থীদের আর্থসামাজিক অবস্থার সম্পর্ক কতোটুকু?
গ. পিতামাতার ধর্মীয় ও সামাজিক বিশ্বাসের কারণে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার মানের ওপর যে প্রভাব পড়ে, তার স্বরূপ কীরকম?

উপরের তিনটি প্রশ্ন কি আদৌ গবেষণার প্রশ্ন হতে পারে? উত্তর হচ্ছে- পারে; যদি না সাম্প্রতিককালে অন্য কোনো গবেষণা থেকে এ প্রশ্নগুলোর ‘গ্রহণযোগ্য’ উত্তর ইতোমধ্যে বেরিয়ে যায়। লক্ষ্য করুন, গ্রহণযোগ্য শব্দটিকে ইনভার্টেড কমার মধ্যে রাখা হয়েছে এবং এ গ্রহণযোগ্যতা বিষয়টি নানা ফ্যাক্টর বা উপাদানের ওপর নির্ভরশীল (পরবর্তীতে ‘গ্রহণযোগ্যতা’র ওপর আলাদা একটি পর্ব থাকবে)। প্রথম প্রশ্নটির ক্ষেত্রে যদি সাম্প্রতিক সময়ে কোনো গবেষণা থেকে এর উত্তর পাওয়া যায়, তাহলে এটিকে নতুন করে গবেষণার প্রয়োজন নেই। কারণ পদ্ধতি বা মেথডলজি ঠিক থাকলে একাধিক গবেষণা থেকে একই ধরনের বা কাছাকাছি ফল পাওয়ার কথা। প্রথমটির ক্ষেত্রে এ কথাটি যেমন জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে, দ্বিতীয় বা তৃতীয়টির ক্ষেত্রে কি তেমনটি বলা যাবে। তৃতীয়টির ক্ষেত্রে একাধিক গবেষণা থেকে কি একাধিক ধরনের ফলাফল আসতে পারে?

পারে। আর এখানেই গুণগত ও পরিমাণগত গবেষণার বিষয়টি আরো খোলাসা হওয়া দরকার। লক্ষ্য করে দেখুন, প্রথমটির ক্ষেত্রে সংখ্যার ভূমিকাই প্রধান। অর্থাৎ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে সেখানে বিভিন্ন শ্রেণীতে কতোজন ছেলে এবং কতোজন মেয়ে আছে সেই হিসাব টুকে কিছু যোগ-বিয়োগ-গুণ-ভাগ করলেই এর উত্তর পাওয়ার কথা। দ্বিতীয়টিতে কিছুটা ভেজাল রয়েছে। গুণগত এবং পরিমাণগত গবেষকদের ঝগড়াটা মূলত হয় এ ধরনের সমস্যা বা প্রশ্নগুলোতেই। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির সাথে শিক্ষার্থীর আর্থসামাজিক অবস্থার সম্পর্ক গুণগত গবেষণায় যেমন বের করা সম্ভব, তেমনি বের করা সম্ভব পরিমাণগত গবেষণাতেও (গুণগত গবেষকদের যারা এদিক-ওদিক মাথা ঝাঁকাচ্ছেন, তাঁদের বলি- ফ্যাক্টর অ্যানালাইসিসের কথা শুনেছেন?)। তৃতীয় গবেষণাটিতে নিশ্চিতভাবেই গুণগত গবেষকরা মাঠ দাঁপিয়ে বেড়াবেন, যদিও পরিমাণগত গবেষকরা বলবেন- তাঁরাও এই প্রশ্নের উত্তর আনতে সক্ষম- perception এবং attitude মাপার অনেক স্কেল রয়েছে দেশেবিদেশে!

তার মানে দ্বিতীয় প্রশ্নটির ক্ষেত্রে গুণগত ও পরিমাণগত গবেষণার দ্বন্দ্ব আমাদেরকে নতুন প্রশ্নের মুখোমুখি করছে। এ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে না চাইলে সিদ্ধান্ত নিতে হবে- এ ধরনের প্রশ্ন থেকে আমরা আসলে কী জানতে চাই- নির্দিষ্ট বিষয় বা পরিপ্রেক্ষিতের বর্ণনা? নাকি ব্যাখ্যা? যদি বর্ণনা হয়, তাহলে পরিমাণগত গবেষণার দিকে ঝুঁকে গুণগতকে সাথে রাখলেই হয়! যদি ব্যাখ্যা হয়, তাহলে গুণগতকে মাঠ ছেড়ে দেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে- পরিমাণগত গবেষণা যেখানে সংখ্যা বা সংখ্যা-সম্পর্কিত বিষয়গুলোকে নিয়ে রীতিমত ৩৬৫ দিন ঘরসংসার করে, গুণগত গবেষণা হয়তো মাসে একবার ফিঁয়াসেকে নিয়ে চাইনিজ রেস্টুরেন্টে ডিনার করার মতো করে সংখ্যাকে ব্যবহার করে- তবে সংখ্যাকে কেউ উপেক্ষা করে না!

তাহলে কি গুণগত গবেষণায় সংখ্যা ব্যবহৃত হয় না?
অবশ্যই হয়, হবে না কেন? গবেষণায় অনেক তথ্য সংখ্যা দিয়ে আনতে হয়- এখন সেটাকে কীভাবে উপস্থাপন করবেন সেটি গবেষকের ব্যাপার! গবেষণার প্রশ্নের উপর ভিত্তি করে, গবেষকের পূর্ব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে গবেষক এসব বিষয় ঠিক করেন। যেমন- তথ্য আনা হলো, বাংলাদেশের সরকারি নীতিনির্ধারণী ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় ৮৭ শতাংশই হচ্ছে পুরুষ, মাত্র ১৩ শতাংশ নারী। পরিমাণগত গবেষক এখানে থেমে যেতে পারেন- যদি তিনি শুধু অবস্থার বর্ণনা (situation analysis) করেন। একই তথ্য গুণগত গবেষক আনলে হয়তো ব্যাখ্যা করতে পারেন এভাবে (আরো অন্যান্য চলকের সাথে তুলনা করে)- বাংলাদেশের সরকারি নীতিনির্ধারণী ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীদের হার এতোই কম যে, তারা আসলে নীতিগত সিদ্ধান্তগুলোকে নারীবান্ধব করতে তুলতে হিমশিম খান; পাশাপাশি নারীদের সিদ্ধান্তগুলোকে পাত্তা না দেয়ার মানসিকতা তো পুরুষদের রয়েছেই। উল্লেখ্য, গুণগত গবেষক এই যে ব্যাখ্যাটি দিলেন, সে ধরনের ব্যাখ্যা কিন্তু পরিমাণগত গবেষকরাও দিতে পারেন- এগুলোর জন্য নানা ধরনের ক্যারিকেচার রয়েছে (মূলত সেই ক্যারিকেচারগুলো উপস্থাপনের জন্যই এই সিরিজের জন্ম, সুতরাং ধৈর্য্য ধরে সাথে থাকুন)।

একক এবং চলক (units and variables)
একক এবং চলক নিয়ে কথা বলার আগে দুটো প্রশ্নের দিকে তাকাই।

১. প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কত শতাংশ ছাত্র আর কত শতাংশ ছাত্রী?
২. প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কত শতাংশ মানুষ আর কত শতাংশ রয়েল বেঙ্গল টাইগার?

দ্বিতীয় প্রশ্নটা দেখে হাসাহাসির দরকার নাই, কারণটা বিষয়টা আসলেই সিরিয়াস। এই প্রশ্ন দুটো বুঝলেই আপনি বুঝে যাবেন একক আর চলকের মধ্যে পার্থক্যটুকু- যদিও দুটো ভিন্ন বিষয় কিন্তু অনেকে একক এবং চলককে গুলিয়ে ফেলেন। প্রথম প্রশ্নের জন্য আমরা কাদের কাছ থেকে তথ্য আনবো? হয় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে, কিংবা শিক্ষকের কাছ থেকে কিংবা বিদ্যালয় থেকে। যাদের কাছ থেকে এসব তথ্য আনা হবে বা আনা হয়, তাদেরকে এক কথায় একক বা তথ্য সংগ্রহের একক বলা যায়। একই গবেষণায় একাধিক ‘একক’ থাকতে পারে- যেমন পিতা বা মাতা, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, এসএমসির চেয়ারম্যান ইত্যাদি। অর্থাৎ নির্দিষ্ট উত্তরদাতা বা তথ্য সংগ্রহের নির্দিষ্ট স্থান বা নির্দিষ্ট উৎস হচ্ছে একক।

দ্বিতীয় প্রশ্নটির উত্তর কী হবে বলুন তো? নিশ্চয়ই কেউ বলবেন না যে- প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ৯৯ শতাংশ মানুষ আর ১ শতাংশ রয়েল বেঙ্গল টাইগার বা এ ধরনের কিছু! অর্থাৎ বুঝাই যাচ্ছে, এই প্রশ্নের উত্তর আপনি যার কাছ থেকেই আনুন আর যেভাবেই আনুন- উত্তর আসবে একটাই- মানুষ ১০০% আর রয়েল বেঙ্গল টাইগার ০%। এখন যে প্রশ্নের উত্তর ১০০% এবং আপনার তা জানা এবং অন্য এককের সাথে তুলনা করা বা পার্থক্য করার মতো কিছু নাই, সেটি কি আদৌ আনার দরকার আছে? নিশ্চয়ই নেই। এবং এ থেকেই বুঝা যায়, চলক বলতে আমরা সেটিকেই বুঝাই যখন নির্দিষ্ট উত্তরের মান একই হবে না, অর্থাৎ পার্থক্য (vary) থাকবে। আর এই পার্থক্য থাকা বা vary করার কারণেই তা variable.

আরেকটি সহজ উদাহরণ দিই একক এবং চলকের পার্থক্য বুঝার জন্য। মনে করুন, আপনার গবেষণা থেকে জানতে চাইছেন পঞ্চম শ্রেণীতে যারা পড়াশুনা করে, তাদের গড় বয়স কত? সেক্ষেত্রে বয়স জানার ক্ষেত্রে আপনি কী করতে পারেন? সহজ উপায় হচ্ছে- শিক্ষার্থীদেরকে জনে জনে গিয়ে জিজ্ঞাসা করা যে তার বয়স কত? এক্ষেত্রে শিক্ষার্থী হচ্ছে আপনার তথ্য সংগ্রহের একক। যদি মনে করেন শিক্ষার্থী ঠিকমতো তার বয়স বলতে পারবে না, আপনি অভিভাবকের কাছে জিজ্ঞাসা করে উত্তর আনতে চান, সেক্ষেত্রে অভিভাবক হবেন আপনার তথ্য সংগ্রহের একক। এখন আপনি ১০০ জন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে তথ্য আনলে একেক জনের বয়স হবে একেক রকম। অর্থাৎ আপনি ১০০টি আলাদা আলাদা উত্তর পাবেন (যার মধ্যে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বয়স মিলেও যেতে পারে)। তার মানে উত্তরগুলোতে পার্থক্য থাকছে বা উত্তরে উত্তরে vary করছে। সুতরাং এখানে বয়স (age) হচ্ছে চলক।

অনুসিদ্ধান্ত (hypothesis)
এসব ফালতু ভ্যাজর ভ্যাজর শুনতে আপনার নিশ্চয়ই ক্লান্তি লাগছে? আমারো… ঘুম পেয়ে যাচ্ছে, আজকে বরং এ পর্যন্তই থাকুক। ফালতু ভ্যাজর ভ্যাজর শুনতেই তো আমাদের জন্ম, তা আরেকদিন শোনা যাবে। তবে যাওয়ার আগে একটি পরিসংখ্যান শুনিয়ে যাই-

১৯৫০ সালে সারা বিশ্বে গরুর সংখ্যা ছিল ৭২০ মিলিয়ন যা ২০০১ সালে এসে দাড়িয়েছে ১.৫৩ বিলিয়নে- ২০১১ সালে গরুশুমারি হয়েছিল কিনা জানা নেই। এই ১.৫৩ বিলিয়ন গরুর মধ্যে আফ্রিকাতে ছিল ২৩০ মিলিয়ন, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে ৯৮ মিলিয়ন, চায়নাতে ১৩০ মিলিয়ন। সবচেয়ে বেশি গরু অবশ্য ইন্ডিয়াতে ২৮৩.১ মিলিয়ন। অবশ্য আমরা যাদেরকে গরু বলে গালি দিই, তাদেরকে এই হিসাবে ধরা হয়েছে কিনা তা অবশ্য জানা নেই। স্যরি।


নোট ১: কোনো কিছু কঠিন লাগছে কি? লাগলে নির্দ্ধিধায় বলে ফেলুন। যারা কঠিন করে বলেন, কঠিন করে লিখেন- আপনার মতোই আমিও তাদেরকে অপছন্দ করি। সুতরাং এই একই কারণে আপনি আমাকে অপছন্দ করবেন, তা তো হতে দেয়া যায় না! তাই না?

নোট ২: কোথাও কোনো ভুল থাকলে ধরিয়ে দিতে মোটেই দ্বিধা করবেন না।

লেখক: রিসার্চ কোঅর্ডিনেটর, প্ল্যান বাংলাদেশ, ঢাকা।

3 COMMENTS

  1. দাদা, অনেক ধন্যবাদ সুন্দর লেখা দেবার জন্য। লেখার ধারাটি সুন্দর ভাবেই যাচ্ছে। পরের পর্বগুলো দিয়ে দিলে খুব উপকৃত হতাম। আমি আপনার লেখার উপর নির্ভর করে বিষয়গুলো (যেগুলো ২য় পর্বে লিস্ট আকারে দিয়েছিলেন+ এসপিএসএস) শিখতে চাচ্ছি।

  2. চলক বলতে আমরা সেটিকেই বুঝাই যখন নির্দিষ্ট উত্তরের মান একই হবে না, অর্থাৎ পার্থক্য (vary) থাকবে। আর এই পার্থক্য থাকা বা vary করার কারণেই তা variable. but প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কত শতাংশ মানুষ আর কত শতাংশ রয়েল বেঙ্গল টাইগার? এটার উত্তর সবার কাছে একই হবে ৷তাহলে এটা চলক হয় কিভাবে???

  3. বাকী পর্বগুলো কই, যেগুলো ২য় পর্বে লিস্ট আকারে ছিলো? কবে আমরা সেগুলো পড়তে পারবো?
    আপনার বিষয়গুলো নিয়ে লেখা খুবই জরুরী, বিশেষ করে আমাদের মতো পাঠকের জন্য। একইসাথে লেখা খুবই ভালো হচ্ছে।

শাহিদ রহমান শীর্ষক প্রকাশনায় মন্তব্য করুন Cancel reply

Please enter your comment!
Please enter your name here