কোচিং সেন্টার, ছবি-কৃতজ্ঞতা: Shampratikdeshkal
কোচিং সেন্টার, ছবি-কৃতজ্ঞতা: Shampratikdeshkal

আকতার বানু


বাংলাদেশের ১৯৬০ সালের চাকরীবিধি অনুযায়ী বিদ্যালয়ের শিক্ষক, ১৯৭৯ সালের চাকরীবিধি অনুযায়ী উচ্চমাধ্যমিক কলেজশিক্ষক, ১৯৯৪ সালের চাকরীবিধি অনুযায়ী ডিগ্রি অনার্স কলেজের শিক্ষকরা প্রাইভেট পড়াতে পারবেন না। অন্য চাকরিও করতে পারবেন না। কিন্তু এসব বিধির বাস্তবায়ন নেই। শিক্ষকরাও তা মানছেন না। ফলে শিক্ষকদের অনৈতিক কোচিং ব্যবসা বাংলাদেশের মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থাকে বিকলাঙ্গ করে দিচ্ছে দিন দিন।

বর্তমানে বাংলাদেশে মূলত শিক্ষকদের সীমাহীন লোভের কারণে কোচিং ব্যবসার লাগামহীন প্রসার ঘটেছে গোটা দেশে। শহর তো বটেই, গ্রামের বিদ্যালয়গুলোতেও প্রাইভেট ব্যবসা জমজমাট। শিক্ষকরূপী এসব কোচিং ব্যবসায়ীর হাতে জিম্মি সব শ্রেণি-পেশার শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা।

আগে কোনো শিক্ষার্থী প্রাইভেট না পড়লে শিক্ষকরা তাকে বাধ্য করত না। এখন শিক্ষকরা প্রাইভেটে শিক্ষার্থী আনার জন্য নম্বর কম দেয়া, শিক্ষার্থীদের মারা, ইচ্ছে করে কঠিন প্রশ্ন করা, যারা পড়ে তাদেরকে পরীক্ষার আগে প্রশ্ন আউট করে দেয়া, তাদেরকে নম্বর বেশি দেয়া, যারা পড়ে না, তাদেরকে কম নম্বর দেয়া, অভিভাবকদেরকে নানাভাবে চাপ দেয়া, ইত্যাদি নানা কূটকৌশল অবলম্বন করেন।

কোচিং বাণিজ্য ভয়াবহভাবে বেড়ে যাওয়ায় এসব লোভী শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অভিভাবক ঐক্য ফোরাম আদালতে ২০১১ সালের শেষের দিকে একটি রিট করেন। এর ফলে শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্যের বিরুদ্ধে ২০১২ সালে “শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং-বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা ২০১২” প্রণয়ন করেছে বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ নীতিমালা অনুসারে কোনো শিক্ষক তাঁর নিজ প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়াতে পারবেন না। প্রতিষ্ঠান-প্রধানের অনুমতি নিয়ে অন্য বিদ্যালয়ের একসাথে সর্বোচ্চ দশ জন শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়াতে পারবেন। অভিভাবকদের অনুরোধে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিদ্যালয়ের ভিতরেই অল্প ফিতে প্রতিষ্ঠান-প্রধানের অনুমতিক্রমে অতিরিক্ত ক্লাস করানো যাবে।

এ নীতিমালা না মানলে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে নানা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কথা বলা আছে। যেমন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিও স্থগিত বা বাতিল, সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে সাময়িক বা স্থায়ী বরখাস্ত, পেশাগত অসদাচরণের কারণে শৃঙ্খলা আপীল বিধি অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি ও পাঠদান অনুমতি বাতিল ইত্যাদি।

কিন্তু এসব আইন বা নীতিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকরা ক্লাসে দায়সারাভাবে পড়িয়ে ছুটছেন প্রাইভেট পড়াতে। কখনও নিজ বাসায় বা বিভিন্ন কোচিং সেন্টারে। শিক্ষার্থীদের গাদাগাদি করে বসিয়ে ব্যাচের পর ব্যাচ পড়াচ্ছেন। এমনকি বিদ্যালয়ের বা কলেজের ক্লাসে ঠিকমত না পড়িয়ে বিদ্যালয় ছুটির পর কোচিং ক্লাসে বেশি টাকা নিয়ে ঠিকই যত্ন করে পড়াচ্ছেন ওই বিদ্যালয় বা কলেজেই।  শিক্ষার্থীরাও ক্লাসে হাজিরা দিয়েই ছুটতে বাধ্য হচ্ছে এসব শিক্ষকদের কাছে। প্রচুর ভালো নামকরা শিক্ষক আছেন যারা ক্লাসে ভালো না পড়ালেও কোচিঙে খুবই ভালো পড়ান। শিক্ষকরা ক্লাসে ঠিকমত পড়িয়ে দিলেই শিক্ষার্থীদের কোচিঙের পিছনে ছুটতে হতো না। অভিভাবকদেরও অর্থ, সময় ও শ্রমের অপচয়ও হতো না।

কেন অভিভাবকরা ছেলেমেয়েদের প্রাইভেটে পড়তে দেন বা শিক্ষার্থীরা পড়ে?

১। পিএসসি-জেএসসি পরীক্ষা প্রবর্তন: পিএসসি-জেএসসি—এ দুটো পাবলিক পরীক্ষা প্রবর্তনের ফলে এগুলোর ফলাফলের গুরুত্ব শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছে বেড়ে যাওয়ার কারণে ভালো ফলের আশায় বাধ্য হয়ে অভিভাবকরা ছেলেমেয়েদের প্রাইভেট পড়াচ্ছেন।

২। ক্লাসে শিক্ষকদের ঠিকমত না পড়ানো: এখন ক্লাসের পড়ায় ছেলেমেয়েরা ভালো করতে পারছে না। কারণ শিক্ষকরা ইচ্ছে করে ক্লাসে ঠিকমত পড়ান না। পড়ালে শিক্ষার্থীরা তাদের কাছে প্রাইভেট পড়বে না। ঠিকমত না পড়ানোর কারণে শিক্ষার্থীরা পড়া বোঝে না, রেজাল্ট খারাপ করে। তাই তারা বাধ্য হয়ে প্রাইভেট পড়ে।

৩। সৃজনশীল পদ্ধতি চালু: সৃজনশীল পদ্ধতি চালু হওয়ার কারণে অভিভাবকরা এ পদ্ধতি বোঝেন না। তাই নিজে আর ছেলেমেয়েদের পড়াতে পারেন না। এই না পারার কারণে অনিচ্ছাসত্ত্বে বাধ্য হয়ে প্রাইভেট পড়ান।

৪। ভর্তি পরীক্ষা: বাংলাদেশের সব ভালো বিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা না দিয়ে কোনো শিশু ভর্তি হতে পারে না। অর্থাৎ  বিদ্যালয়ে আসার আগেই শিশুকে অনেক কিছু শিখে আসতে হয় যা তার বিদ্যালয়ে আসার পরে শেখার কথা। প্রাইভেট পড়ানো শুরু হয় মূলত ভালো বিদ্যালয়ে ছেলেমেয়েদের ভর্তি করানোর জন্য। কারণ ওসব বিদ্যালয়ের ফল ভালো। তাই ধরেই নেয়া যায় ভর্তি করাতে পারলে ভালো ফল সুনিশ্চিত। তাই ভালো বিদ্যালয়ে যাতে ভর্তি পরীক্ষায় ভালো করতে পারে, সেজন্য প্রাইভেট পড়ান অভিভাবকরা।

ভালো নম্বর না পেলে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি পরীক্ষা দেয়ার সুযোগই দেয়া হয় না। এখন তো আবার ভালো নম্বর পেলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে একবারের বেশি ভর্তি পরীক্ষা দিতে দেয়া হয় না। আগে দ্বিতীয় বিভাগ পাওয়া শিক্ষার্থীও বুয়েটে চান্স পেয়েছে যেটি এখন অসম্ভব। তাই যেকোনো মূল্যে ভালো নম্বর পাওয়াটা অনিবার্য। আর ভালো ফল বা নম্বরের জন্য প্রাইভেট না পড়ে উপায় নেই।

৫। প্রশ্ন আউট বা ভালো ফলের নিশ্চয়তা: এখন ভালো ফলাফল নির্ধারণ করে টাকা। অর্থাৎ টাকা খরচ করে বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছে প্রাইভেট পড়লে শিক্ষকরা পরীক্ষার আগেই প্রশ্ন বলে দেন, বেশি নম্বর দেন। ফলে ফল ভালো হয়। প্রাইভেট না পড়লে ভালো নম্বর পাওয়া যায় না, ফলও ভালো হয় না।

অভিভাকরা কোচিঙে শিশুদের দিচ্ছেন। কারণ তাঁরা তার সুফল পাচ্ছেন। উদাহরণ দিই। আমি ক্লাস ওয়ানে আমার মেয়েকে নামতা পড়িয়েছি। কিন্তু পরীক্ষায় প্রশ্ন এসেছে গুণ আকারে। যেমন, ৩-এর ঘরের নামতা লেখার পরিবর্তে তিন গুণ চার সমান কত? এভাবে প্রশ্ন এসেছে। যারা কোচিং করেছে, তাদেরকে এভাবেই শেখানো হয়েছে। ফলে তারা পারবে। যেসব শিশু কোচিং করেনি তারা প্রশ্ন না বোঝার কারণে পারবে না বা ভুল করতে পারে। ফলে ফল খারাপ হবে। আবার ইংরেজি প্রশ্নের উত্তর প্রথম শ্রেণির শিশুদের বানিয়ে লিখতে পারার কথা না। তাই কোচিঙে যেসব প্রশ্নোত্তর মুখস্থ করানো হয়, শিক্ষকরা সেগুলোই পরীক্ষায় দেন। ফলে কোচিং করা শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন কমন পায়, রেজাল্ট ভালো হয়। আবার বিভিন্ন ভালো বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ভর্তি পরীক্ষার কোচিং করান, আবার ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নও করেন। তাই প্রশ্ন আগেই বলে দেন। শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন কমন পায়, ভর্তির সুযোগও পায়। ফলে ওসব শিক্ষকদের কাছে প্রাইভেট পড়ার হিড়িক পড়ে যায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক (কখনো কখনো স্বামী ও স্ত্রী দুজন) তাঁর প্রথম বা দ্বিতীয় শ্রেণির শিশুকে পড়াতে পারবেন না এটি হতে পারে না। কিন্তু বাস্তবতা হল, মেধাবী, শিক্ষিত, পেশাজীবী অভিভাবকরা, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও তাঁদের বিদ্যালয়-পড়ুয়া সন্তানদের নিয়ে ধর্না দিচ্ছেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক বা কোচিং সেন্টারে উপর্যুক্ত সুবিধা পাওয়ার জন্য। সময়, শ্রম ও মেধার কি নিদারুণ অপচয়!

ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত আমার মেয়ের গৃহশিক্ষক ছিল না। সব বিষয় আমি নিজে পড়াতাম। কোন কোচিঙেও দিইনি, কারণ আমি চেয়েছি আমার মেয়ে ক্লাসে প্রথম না হোক, তবে ওর ভিত্তি যেন দুর্বল না হয়। তাতে মেয়ে পিএসসি পরীক্ষায় ভালো করলেও বিদ্যালয়ের পরীক্ষায় তার রোল এক থেকে দশের মধ্যে ছিল না, যদিও আমি জানি সে খারাপ শিক্ষার্থী নয়।

আমাদের সময়ে সৃজনশীল ছিল না। তবু কিছু কম শিখেছি বলে মনে হয় না। আমাদের সময়ও বিজ্ঞান গ্রুপের ছেলেমেয়েরা প্রাইভেট পড়ত, তাও অল্প কিছু বিষয়ে। আমি নিজেও বিদ্যালয়ে কখনও কোনো বিষয়ে প্রাইভেট পড়িনি। কলেজে পরিসংখ্যান প্রাইভেট পড়েছি বিশ দিন। শুধু যেগুলো নিজে পারতাম না, সেগুলো (বিদ্যালয়ে থাকতে আব্বা পড়াতেন অংক আর ইংরেজি, তাও শুধু যেগুলো নিজে নিজে পারতাম না সেগুলো। তাতে আমার ফল খারাপ হয়নি। আমি এসএসসি-তে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল থেকে রাজশাহী বোর্ডে মানবিক বিভাগ থেকে মেয়েদের মধ্যে প্রথম ও সম্মিলিত মেধা তালিকায় অষ্টম স্থান এবং এইচএসসি-তে রাজশাহী কলেজ থেকে রাজশাহী বোর্ডের মানবিক বিভাগ থেকে মেয়েদের মধ্যে প্রথম ও সম্মিলিত মেধা তালিকায় তৃতীয় স্থান অধিকার করি। আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় হতে মনোবিজ্ঞানে অনার্স ও মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছি)।

আর এখনকার পড়ালেখার ধরন এমন হয়েছে যে, শিক্ষার্থীদের প্রতিটি বিষয়ের প্রতিটি অধ্যায়ের প্রতিটি প্যারা টিউটরের কাছে শিখে নিতে হয় সৃজনশীল পদ্ধতি না বোঝার কারণে বা যেকোন প্যারা থেকে প্রশ্ন হওয়ার সম্ভাবনা আছে বলে। একারণে এখনকার শিশুরা সব বিষয়ে প্রাইভেট পড়ে। ধর্ম, সমাজ এমনকি মাতৃভাষা বাংলাও। ক্লাসের প্রথম যে শিক্ষার্থী, সে সবচেয়ে বেশি প্রাইভেট পড়ে। অর্থাৎ রেজাল্টের কৃতিত্ব এখন শিক্ষার্থীর নয়, প্রাইভেটের। যেসব অভিভাবকের সাধ্য আছে, তাঁরা প্রাইভেট পড়াচ্ছেন। আর যাঁদের নেই তাঁরা যে কী কষ্ট করে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার বাড়তি খরচ জোগাড় করছেন, তা তাঁরাই হাড়েহাড়ে টের পাচ্ছেন।

৬। অভিভাবকদের ধারণা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা: প্রাইভেট ছাড়া ভালো ফল করা যায় না, এ ধারণা এখন বদ্ধমূল। বাস্তবতাও তাই। অভিভাবকরা জানেন, শিক্ষকরা ক্লাসে ভালো করে পড়াবেন না, প্রাইভেট না পড়লে শিক্ষার্থীরা ভালো বুঝবে না, শিক্ষকরা ভালো নম্বরও দেবেন না। তাই এটি মেনে নিয়েই অভিভাবকরা ছেলেমেয়েদের প্রাইভেটে পড়তে দেন।

৭। অভিভাবকদের সৃজনশীল পদ্ধতি সম্পর্কে অজ্ঞতা: আগে অভিভাবকরা নিজেরাই নিজেদের সন্তানদের পড়াতেন। সৃজনশীল পদ্ধতি না বোঝার কারণে এখন অভিভাবকরা আর সেটি পারেন না। তাই বাধ্য হয়ে তাঁরা শিক্ষকদের দ্বারস্থ হচ্ছেন।

৮। তীব্র প্রতিযোগিতা: এখন প্রতিযোগিতায় টিকতে হলে ভালো ফল করতেই হবে। যেজন্য প্রাইভেট না পড়ে উপায় নেই। তাই ভালো বিদ্যালয়ে, ভাল কোচিঙে ভালো শিক্ষকের কাছে পড়ানোটা জরুরি। অনেকের কাছে এটি মানসিক তৃপ্তি ও ভরসার কারণও। তাছাড়া বিত্তবানরা পড়ানোর জন্য টাকা খরচ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেন না। তাই শিক্ষকরাও লোভী হন বাড়তি আয়ের জন্য। এ-কারণে তুলনামূলকভাবে অস্বচ্ছল অভিভাবকরাও বাধ্য হচ্ছেন শিক্ষকদের এ লোভের খোরাক জোগাতে।

৯। অভিভাবকদের ব্যস্ততা: এখন মা-বাবা ব্যস্ততার কারণে সন্তানদের পড়াশোনার পিছনে সময় দিতে পারেন না। এখন প্রশ্নের ধরন এমন যে, গাইড বই না পড়লে পড়ানো যায় না। অভিভাবকদের অত মোটা মোটা গাইড বই পড়ে সন্তানদের পড়ানোর বিড়ম্বনার চেয়ে কোচিঙে দেয়া বেশি সহজ। তাছাড়া প্রাইভেট না পড়লে ফল খারাপ করবে, অভিভাবকরা এ ঝুঁকি নিতে চান না।

১০। শিক্ষকদের জবাবদিহিতার অভাব: আমাদের দেশে ছাত্র-ছাত্রী ফেল করলে বা খারাপ করলে শিক্ষকদের কোনো জবাবদিহিতা নেই বা শাস্তিও হয় না। ফলে শিক্ষকরা বিদ্যালয়ে কম, কোচিং বা প্রাইভেটে বেশি পড়ান। ইচ্ছে করে ক্লাসে শিক্ষার্থীদের ভালো করে পড়ান না বা ফল খারাপ করান যাতে শিক্ষার্থীরা প্রাইভেট পড়তে আসে বা অভিভাবকরা পড়তে পাঠান ইত্যাদি।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দূরবস্থার কারণ

উন্নত দেশগুলোতে, যেমন ফিনল্যান্ড, পরিবেশ থেকে কোনো একটি ঘটনা তুলে এনে সেটির সাথে সম্পৃক্ত সবগুলো বিষয় শেখানো হয়। নানা বিষয় আলাদা আলাদাভাবে শেখানো হয় না। যেমন, কোনো একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যেমন বন্যা পড়াতে গিয়ে এর কারণ ( বিজ্ঞান—বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, ভূগোল—পরিবেশের পরিবর্তনে আবহাওয়ার ও ভৌগোলিক অবস্থানের ভূমিকা, সমাজ—এর সাথে মানুষের জীবনপ্রবাহের নানা সমস্যা, জীববিজ্ঞান, উদ্ভিদবিজ্ঞান ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাথে মানুষ, উদ্ভিদ ও প্রাণীর রোগ, গবেষণা—প্রতিকারের উপায় উদ্ভাবন) ইত্যাদি সবকিছুকে সমন্বিতভাবে পড়ানো হয়। ফলে শিক্ষার্থীর শিক্ষা যেমন বাস্তবমুখী হয়, তেমনি শিক্ষার্থীর পড়াশোনা নিজের, দেশের ও সমাজের কাজে লাগে।

এজন্য উন্নত দেশগুলোতে লেখাপড়ার ধরন পাল্টে যাচ্ছে। তারা শিশুদের একটি কফি শপ দিয়ে বলে, আগামী এক বছর এই দোকানটি চালানো তোমার পরীক্ষা। দোকান চালাতে গিয়ে তারা হাতেনাতে অংক শিখেছে, কফি বিক্রি করতে গিয়ে তারা মার্কেটিং শিখেছে, পুরো ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে তারা ম্যানেজমেন্ট শিখেছে, লাভ-লসে পড়ে অর্থনীতি শিখেছে।

যেসব ছেলেমেয়ে মেকানিক্যাল কাজ জানে, তাদের দেয়া হয় গ্যারেজ বা কোনো খুচরা যন্ত্রাংশের দোকান, কাউকে দেয়া হয় কাপড়ের বা শৌখিন জিনিসের দোকান, কাউকে দেয়া হয় কোনো যন্ত্র বানানো বা কম্পিউটার প্রোগ্রামিঙের কাজ। যে যার দক্ষতা দিয়ে দোকান চালাবে বা কাজ করবে। প্রত্যেকের পারদর্শিতার ভিত্তিতে নম্বর দেয়া হবে। এতে তার অ্যাকাডেমিক শিক্ষার সাথে সাথে ভবিষ্যত কর্মজীবনের দিকনির্দেশনাও পাওয়া হয়ে যায়।

ভারতে একটি বিদ্যালয়ে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যবিষয়ক একটি অধ্যায় বাস্তব প্রয়োগ পদ্ধতিতে শিখতে গিয়ে বিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা সে গ্রামের কলেরা, টাইফয়েড, ডায়রিয়া নির্মূল করেছে। আসলে এটিই দরকার। কোনোকিছু শেখার সাথে সাথে সেটি কোথায় কাজে লাগবে, সেটি শেখানো বেশি জরুরি।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এসবের বালাই নেই।

শিশুদের যাতে বিদ্যালয় ও পড়াভীতি তৈরি না হয় সেজন্য প্রথম ছয় বছর খেলাধুলা, ছবি আঁকা, গল্প করা, নাচ, গান এসব করানো হয় উন্নত দেশগুলোতে। পরীক্ষাভীতি শিশুদের শেখার আগ্রহ নষ্ট করে। তাই ফিনল্যান্ডে বিদ্যালয়ে যাওয়ার পর প্রথম ছয় বছর কোনো পরীক্ষা হয় না। ১০ বছর পর শিশুরা প্রথম বড় ধরনের কোনো পরীক্ষা দেয়।

মনোবিজ্ঞানীদের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, বিরতিহীন শেখার চেয়ে বিরতিসহ শেখালে শিক্ষার্থীরা ভালো শেখে। তাই জাপানে শেখার মাঝখানে বাধ্যতামূলক বিরতি, এমনকি, কোনো কোনো বিদ্যালয়ে ঘুমানোর সুযোগও আছে। শিশুরা বাবা-মার সঙ্গ ও মা-বাবার সাথে দুপুরের খাবারের আনন্দ থেকে বঞ্চিত না হয়, সেজন্য সেভাবে বিদ্যালয়ের সময় স্থির করা হয় ফ্রান্স ও মেক্সিকোতে। শিক্ষার কোনো স্তরে শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়তে হয় না। বেলজিয়ামে দশ বছর পর্যন্ত কোনো হোমওয়ার্ক দেয়া হয় না। পৃথিবীর সব উন্নত দেশে পড়ার চাপ কমাতে সহপাঠ্যক্রমিক কার্যক্রম চালানো হয় পড়ার সমান গুরুত্ব দিয়ে।

ভার্সিটিতে প্রথম বর্ষে পড়ুয়া এক শিক্ষার্থী মাসখানেক আগে আমার কাছে এসে বলল, “ম্যাডাম, আমি খুব গরীব ঘরের ছেলে। মেসে থাকার সামর্থ নাই। তাই হলে এক বড় ভায়ের কাছে থাকি। সে নানাভাবে আমাকে তাচ্ছিল্য করে। রান্না করা, তার এঁটো প্লেট ধোয়া, ঘর ঝাড় দেয়া, তার সিগারেট কিনে আনা এসব আমাকে দিয়ে করায়। অনেক রাত পর্যন্ত বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়। আমি পড়তে পারি না।”

আমাদের ছেলেমেয়েরা হলে গাদাগাদি করে থেকে পড়ে, হলে সিট পায় না, সিনিয়রদের চাকর হয়, বিদ্যুৎ থাকে না ঠিকমত, ডাইনিং-এর বাসি, পচা, অখাদ্য খাবার খায়। মাঝে মাঝে শুনি তাদের নাকি শেয়াল-কুকুরের মাংসও খাওয়ানো হয়। আছে সেশনজট, বই-কম্পিউটার কেনার টাকা নেই ইত্যাদি হাজার কষ্ট। আর পাস করে চাকুরি নেই, বেকারভাতাও নেই। মামার জোর, ঘুষ, রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর লোক এসব না থাকলে চাকরিও জোটে না। মধ্যবিত্ত ও গরীব অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা নানাভাবে নিষ্পেষিত। আর লাভবান হয় লোভী শিক্ষকরা, কোচিং-গাইড বই ব্যবসায়ীরা।

অথচ আমাদের ছেলেমেয়েরা যথেষ্ট মেধাবী, পরিশ্রমী। মেধাবী বলেই তারা বিদেশের নামীদামী কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভালো করে। কারণ ওখানে হাতেকলমে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারে, দেশে যেটা পারে না মুখস্থনির্ভর পড়ালেখার কারণে। আমাদের নিরক্ষর, অর্ধশিক্ষিত প্রবাসী শ্রমিকরা হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করেই আমাদের দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছে।

জেএসসি, পিএসসি, সৃজনশীল ইত্যাদি নানা নতুন নতুন পদ্ধতি চালু, এ প্লাসের ছড়াছড়ি, ভুল লিখলেও শিক্ষকদেরকে নম্বর বেশি দিয়ে এ প্লাস বাড়ানো বা শতভাগ পাস করানোর চাপ, বছরে তিনটা পরীক্ষা দেয়া, ক্লাস টেস্ট দেয়া, প্রাইভেট পড়ার চাপ ইত্যাদি  নানা সমস্যা তো আছেই।

সামগ্রিকভাবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় যে ধ্বস নেমেছে সেটি রদ করতে হলে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার এ দুরবস্থা খুব দ্রুত বদলানো দরকার।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here