বাংলাদেশের শিক্ষা - ছোট
বাংলাদেশের শিক্ষা - ছোট


মাছুম বিল্লাহ: শান্ত ও নীরব পরিবেশ যে কোনো ধরনের পরীক্ষার্থীদের জন্য প্রথম ও প্রধান শর্ত। দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, আমরা আমাদের পরীক্ষার্থীদের জন্য সে পরিবেশ নিশ্চিত তো করতে পারিইনি; বরং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বারবার পেছাতে হয়েছিল এবারকার এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা। রাজনৈতিক সহিংসতার  কারণে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে দেশের  পুরো শিক্ষাকার্যক্রম।  অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে শিক্ষার্থীরা। পরিপূর্ণ শিক্ষালাভের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা যাদের সংখ্যা প্রায় সোয়া চার কোটি।

দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে প্রায় তিন কোটি ৬৮ লাখ ৮৬ হাজার ১৭২ জন শিক্ষার্থী আছে। দেশের ৩৫টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় বিশ লাখ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত বিভিন্ন কলেজে প্রায় ১৪ লাখ, বেসরকারি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় তিন লাখসহ সারা দেশে প্রায় সোয়া চার কোটি শিক্ষার্থী আছে। ভবিষ্যতে যাদের দ্বারা পরিচালিত হবে দেশ ও জাতি, তাদের শিক্ষাগ্রহণকাল এবং পরীক্ষাগ্রহণের দিনগুলো বিভিন্নভাবে বাঁধাগ্রস্ত হচেছ।

হরতালে প্রত্যক্ষ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা। দেশের সবচেয়ে বড় দুই পাবলিক পরীক্ষা হরতালের বিপত্তির কারণে বারবার পেছাতে হয়েছে। ১০ লাখ শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে শুরু হওয়া চলমান এইচএসসি পরীক্ষা এরই মধ্যে ছয়দিন হরতালের কবলে পড়েছে। হরতালের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত পরীক্ষা ও ক্লাস নিতে পারছে না। ক্লাস বন্ধের পাশাপাশি একের পর এক পরীক্ষা পেছাতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। লেখাপড়ার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান সাপ্তাহিক ছুটি বাতিল করে শুক্র ও শনিবারে ক্লাস ও পরীক্ষা গ্রহণ করছে।

ও এবং এ লেভেল পরীক্ষা হরতালের কারণে ৮ মে সকাল ১১টার পরীক্ষা সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় আর দুপুর ২টার পরীক্ষা ম্যধরাতে রাত তিনটা পর্যন্ত নিতে হয়েছে। ‘ও’ এবং ‘এ’ লেভেল পরীক্ষায় বিঘ্ন সৃষ্ট হলে বিকল্প ব্যবস্থায় পরীক্ষায়  অংশ নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সম্ভবত এ কারণেই ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার বিষয়টি কিছুটা আমলে নিয়েছিলেন আমাদের রাজনৈতিক নেতারা। ‘ও’ এবং ‘এ’ লেভেল পরীক্ষা সারা বিশ্বে ব্রিটিশ কাউন্সিলের অধীনে একইদিনে একই প্রশ্নপত্রে  অনুষ্ঠিত হয়। যদি কোনো দেশে কোনো কারণে নির্দিষ্ট দিনে পরীক্ষা না হয়, তাহলে পরের বছর ছাড়া আর ওই পরীক্ষা নেওয়ার সুযোগ থাকে না। ব্রিটিশ কাউন্সিল কোনো নির্দিষ্ট দেশের জন্য নতুন করে প্রশ্নপত্র তৈরি করে পরীক্ষা নেয় না। নেওয়ার বিধানও নেই।

৮ মে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় অনুষ্ঠিত হয় ‘এ’ লেভেল রসায়ন পরীক্ষা যা সকাল দশটায় হওয়ার কথা। একই সময়ে ‘ও’ লেভেলের রসায়ন হওয়ার কথা ছিল সকাল এগারটায়। এছাড়া রাত ১২টা থেকে তিনটা পর্যন্ত  ‘ও’ লেভেল গণিত ও বাংলা পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল দুপুর পৌনে ১২ টা থেকে। ৯ তারিখ হরতালের কারণে ‘ও’ এবং ‘এ’ লেভেলের পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষা হয়েছে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায়।

আমাদের দেশের সরকার ও বিরোধীদলীয় নেতারা সবাই দেশের ভাবমূর্তির কথা বলেন। অথচ একমাত্র বাংলাদেশেই রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ভোররাতে  পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এতে কি দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় না? তাদের সবারই জানা যে, আন্তর্জাতিক মানের এই পরীক্ষা পেছানো যায় না। তারপরেও তারা ‘ও’ লেভেল এবং ‘এ’ লেভেল পরীক্ষার দিনগুলোতে হরতাল ডাকছে। হরতাল ডাকছে বিরোধী জোট আর সরকারি জোট তাদের বিরুদ্ধে কিছু কথা বলেই খালাস। কারণ বিরোধীদলে থাকাকালীন তারাও তো একই কাজ করেছে! কাজেই জোর দিয়ে তো কিছু বলতে পারছে না। কিন্তু অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে কোমলমতি পরীক্ষার্থী আর সাধারণ জনগণ।

আমি একজন অভিভাবক হিসেবে ওই ভোররাতের পরীক্ষার কাছে ছিলাম। কিছু কিছু ব্যাপার আমার কাছে বিস্ময়কর মনে হয়েছে। আমাদের দেশে নাকি ২৫টি টিভি চ্যানেল আছে, অথচ কোনো চ্যানেলকে দেখলাম না এই বিশেষ সময়ে রাজনৈতিক গোলযোগের কারণে পরীক্ষা নেওয়ার ওপর কোনো প্রতিবেদন বা তথ্যচিত্র দেখাতে। অথচ সামান্য কোনো রাজনৈতিক কারণেও চ্যানেলগুলো ফলাও করে প্রচার করে সেসব ঘটনা বা বিশ্লেষণ। আর প্রায় পনের হাজার আন্তর্জাতিক প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা এবং গভীর রাতে পরীক্ষা- এ নিয়ে কারুর যেন কোনো চিন্তাভাবনা নেই। গভীর রাতের ১৫ হাজার পরীক্ষাথীর সাথে আরও ৩০থেকে ৪০ হাজার অভিভাবক ছিলেন। অথচ নিরপত্তার জন্য কোনো পুলিশের গাড়িও সেখানে যায়নি। ব্যপারটি দেখে মনে হয়েছে শিক্ষাব্যবস্থা কতটা অবহেলিত! মুখে আমরা যত কথাই বলি না কেন, আমাদের শিক্ষা আসলেই অবহেলিত।

এতকিছুর পরেও একটি বিষয় আমার খুব ভালো লেগেছে । হাজার হাজার পরীক্ষার্থী হরতালের কারণে এবং ঢাকার ট্রাফিক বা নিরাপত্তার কারণে পরীক্ষার কয়েক ঘণ্টা পূর্বে এসে অপেক্ষা করছে বসুন্ধরা কনভেশন সেন্টারের বাইরে। কিন্তু কারোর হাতে কোনো বই নেই, পরীক্ষায় কী আসবে বা আসবে না সে নিয়ে কোনো অভিভাবক বা ছাত্রছাত্রীদের কথা নেই। এটি একটি চমৎকার দৃশ্য, অন্তত আমাদের দেশে। এসএসসি বা এইচএসসি পরীক্ষায় কী হয়? কয়েকশ পরীক্ষার্থী যেখানে পরীক্ষা দিবে, সেখানে কয়েক হাজার বই, নোই বই, নোট খাতা থাকবেই। অভিভাবকদের কাছেও বই বা খাতা বা নোট থাকবে। ছাত্রছাত্রীরা সব বাদ দিয়ে একটু পরপর বই বা নোটে চোখ বুলাচ্ছে কিংবা মুখস্থ করছে এবং বলাবলি করছে কী আসতে পারে পরীক্ষায়, কী আসবে না, গতবার কী এসেছিলো ইত্যাদি। কিন্তু ‘ও’ এবং ‘এ’ লেভেল পরীক্ষায় এ ধরনের কোনো কথা নেই কারণ এখানে কমন পড়ার কিছু নেই। কাজেই আলোচনার কিছু নেই, গাইডের কোনো ব্যাপার নেই। এই বিষয়টি সত্যিই আমার ভালো লেগেছে। এটিই মূলত পরীক্ষা।

আমার প্রতিক্রিয়া শুনে অনেক লোক বলেছেন, বাংলাদেশে ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষা একটি বিলাসিতা। আসলেই কি তাই? আমার মতো ছাপোষা অভিভাবক কি বিলাসিতার জন্য ইংরেজি মাধ্যমে আমার মেয়েকে পাঠিয়েছি? না, তা নয়। আমি পাঠিয়েছি বাংলা মাধ্যমের স্কুলগুলোয় ভর্তি হওয়া মানে মহাযুদ্ধ, কমিটির লোকজনকে খুশি করার জন্য মোটা অংকের বকশিস আমি কোত্থেকে দিব। আর ছাত্রছাত্রীর অনুপাতে ঢাকায় তো ভালো স্কুল-কলেজে সিট নেই। তাই বাধ্য হয়েই অনেক অভিভাবক তাদের ছেলেমেয়েদের ইংরেজি মাধ্যমে পাঠায়। ওখানে অন্তত ভর্তি পরীক্ষার মতো পাগলামি নেই। এ বিষয়গুলো সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ভাবতে হবে গভীরভাবে।

মাছুম বিল্লাহ: প্রোগ্রাম ম্যানেজার, ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচি; প্রাক্তন ক্যাডেট কলেজ অধ্যাপক, ঢাকা, বাংলাদেশ।

Previous articleপরিবার থেকে শেখা: বাবা
পরবর্তী লেখাউচ্চশিক্ষায় মাল্টিমিডিয়া প্রেজেন্টেশন পদ্ধতি: বাস্তবতা ও কিছু প্রস্তাবনা
গৌতম রায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে শিক্ষায় স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে শিক্ষা-গবেষক হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেন ব্র্যাকের গবেষণা ও মূল্যায়ন বিভাগে। পরবর্তীতে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-এ যোগ দেন গবেষণা ও মূল্যায়ন সমন্বয়ক হিসেবে। সেখান থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে শিক্ষকতা পেশায় আসেন। তিনি আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ও পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট উভয় পর্যায়ে শিক্ষা-গবেষণার সাথে সম্পর্কিত কোর্সসমূহ যেমন—শিক্ষায় গবেষণা পদ্ধতি, শিক্ষায় মূল্যায়ন ও পরিমাপ, শিক্ষায় কর্মসহায়ক গবেষণা, শিক্ষা গবেষণায় পরিসংখ্যান ইত্যাদি কোর্সসমূহ পড়াচ্ছেন। পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষা বিষয়ে বিভিন্ন গবেষণার সাথেও যুক্ত রয়েছেন। গবেষক হিসেবে তিনি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা, শিক্ষায় মূল্যায়ন পদ্ধতি, শিক্ষা ও আইসিটি, কমিউনিটির সম্পৃক্ততা, শিক্ষায় প্রবেশগম্যতা, শিক্ষা প্রকল্প মূল্যায়ন ইত্যাদি বিষয়ে ৩০টিরও বেশি গবেষণা প্রজেক্টের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শিক্ষা-বিষয়ে তাঁর একাধিক গবেষণাভিত্তিক প্রবন্ধ বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে এবং একাধিক বই প্রকাশিত হয়েছে। শিক্ষা-বিষয়ে নিয়মিত লিখছেন বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও অনলাইন মিডিয়ায়। তিনি ‘বাংলাদেশের শিক্ষা’ ওয়েবসাইটের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here