বাংলাদেশের শিক্ষা - ছোট
বাংলাদেশের শিক্ষা - ছোট


ইয়ামিন রহমান ইস্ক্রা: বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা বোধহয় শিক্ষা প্রচার। শিক্ষাপ্রচার নিঃসন্দেহে একটি জনহিতকর কাজ। তবে কি আমি ভুল বুঝে এই কথাটি বলে ফেললাম? শুনে এসেছি, যুগে যুগে বহু মনীষী শিক্ষাবিস্তারে অবদান রেখে স্মরণীয়-বরণীয় হয়েছেন। কিন্তু, শিক্ষাপ্রচার এবং ব্যবসা দুটি ভিন্ন জিনিস। একটির পেছনে লাভের প্রত্যাশা থাকে না এবং অপরটির পেছনে থাকে লাভের প্রত্যাশা। কোচিং সেন্টারগুলো যদিও দাবি করে তারা শিক্ষাবিস্তার করছে, কিন্তু তাদের নীতি দেখে একে শিক্ষাবিস্তার কার্যক্রম বলে মনে হওয়ার কোনো কারণ নেই। ব্যবসা কথাটিকে এক্ষেত্রে খাপে খাপে মেলানো যায়। কোচিং সেন্টারগুলোকে আমরা আর যাই বলি, শিক্ষাপ্রচারের কোনো মহতী উদ্যোগ বলতে পারি না। তারপরেও, পাঠকবৃন্দ আমাকে পাগল ঠাওরাতেই পারেন। তবে, বিষয়টি খতিয়ে দেখলেই বোধহয় বোঝা যাবে ‘শিক্ষা প্রচার’ জাতীয় শব্দের অন্তড়ালে লুকিয়ে রয়েছে কতবড় ব্যবসা।

সেদিন আসতে বোধহয় আর দেরি নেই, যেদিন শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকেই তাকে কোচিং সেন্টারে পাঠানো হবে। বিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা থেকে এদেশের ছেলেমেয়েরা শুরু করে কোচিং সেন্টারে পড়া এবং তা শেষ হয় দীর্ঘ ১৪ বছর পর ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির মাধ্যমে। এরপর কোচিং শেষ হয়ে যায় বললে ভুল হবে, কারণ এরপর শুরু হয় কোচিং সেন্টারে পড়ানো। ফলে, নিজের পড়াশোনার ব্যাপারে একটু উদাসীনতা দেখা গেলেও পরীক্ষাপূর্ব রাত্রিতে সিলেবাস কাভার করা এদেশের বিশ্ববিদ্যালয়-পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের কাছে একটি বাহাদুরির বিষয় হওয়ায় সেই উদাসীনতাও অতিমানবীয় গুণ বলেই বিবেচিত হয়। সেদিন তো কোচিঙের এক ভাইয়া বলেই ফেললেন, “আমার আগামীকাল পরীক্ষা। এই বইটা আমাকে আজ রাত্রে শেষ করতে হবে, তারপর পরীক্ষা দিতে যাব। আজ সারাদিন তোমাদের এখানে ক্লাশ নেব। বুঝতেই পারছ, আমার ওপর কত চাপ! হেহেহে… তবুও শুধু তোমাদের কথা ভেবেই… ইত্যাদি”।

আর, যারা কোচিং-বলির শিকার হয়, দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে শৈশব-কৈশোরের কী কী অধিকার থেকে যে সে বঞ্চিত হলো তা বুঝতেও পারে না। বুঝতে পারবেই বা কীভাবে? তাদের দায়িত্ব স্বাভাবিকভাবেই থাকে অভিভাবকদের ওপরে। আর অভিভাবকেরা তা ন্যস্ত করেন কোচিং সেন্টারের ওপরে, স্কুল ও কলেজ থাকে কেবল সার্টিফিকেট দেয়ার জন্য। কোচিং সেন্টার যদি সার্টিফিকেট দিতে পারতো, তাহলে বোধহয় এতদিনে স্কুল-কলেজ উঠেই যেত। এখন, সচেতন পাঠকবৃন্দ বলতেই পারেন, অভিভাবকেরাই বা কোচিং সেন্টারের প্রতি আকৃষ্ট হয় কেন?

এ প্রশ্নের জবাব পেতে হলে চলে আসে প্রাসঙ্গিক অনেক বিষয়। শুরুতেই বলা যেতে পারে আমাদের দেশের অভিভাবকবৃন্দ সঙ্গত কারণেই তাদের সন্তানের ভবিষ্যতের ব্যাপারে অনিরাপত্তায় ভোগেন। আর, এই সুযোগটি সৃষ্টি করে দেয় আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও তার সদ্ব্যবহার করে কোচিং সেন্টার ও গাইড ব্যবসায়ীরা। আমাদের দেশের আর সবকিছুর মতো শিক্ষাব্যবস্থাকেও সিস্টেমে ফেলে কোচিং সেন্টার, গাইড ব্যবসায়ীরা। পড়াশোনাকে বেঁধে ফেলা হয় নির্দিষ্ট গণ্ডিতে, কমন-সাজেশন-মুখস্থ- এসব সূত্রে। আমাদের দেশের খুব ভালো স্কুল-কলেজ ছাড়া কোথাও ব্যবহারিক ক্লাশ ঠিকমত করানো হয় না; আমাদের দেশের ব্যবহারিক পরীক্ষার মতো তামাশা আর কোথাও নেই। আমাদের স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিতর্ক, ছবি আঁকা প্রতিযোগিতা, বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এসব বিষয়ে খুব একটা গুরুত্ব দেয়া হয় না। অর্থাৎ, কোনো ধরনের সৃষ্টিশীলতাকে এখানে প্রশ্রয় দেয়া হয় না।

অনেক অভিভাবকদেরই বলতে শুনি, তাদের কাছে সন্তানদের পড়ানোর মতো সময় নেই। তাছাড়া অনেকে বলেন, হাল আমলের পড়াশোনা নাকি তারা বুঝতে পারেন না। কাজেই, কিছু পয়সা খরচ হলেও কোচিং সেন্টারে পাঠানোই ভালো, ঝামেলা থেকে মুক্তি। অথচ, পড়াশোনা শিখিয়ে দেবার দায়িত্ব কিন্তু অভিভাবকের নয়, শিক্ষকের। তা নিশ্চিত করার কথা স্কুল-কলেজের। আর, এটা শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের অধিকার। অথচ, তারা অধিকার ছেড়ে দিয়ে অর্থ ব্যয় করে বিকল্প শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেই বেছে নেন। এর পেছনেও অবশ্য কারণ আছে, তবুও, এটা আমাদের অধিকার বিষয়ে অসচেতনাকেই প্রকাশ করে। সুতরাং, এক্ষেত্রে অনেকাংশে দোষ অভিভাবকদের উপরেই বর্তায়।

আরও একটি ভয়াবহ কথা শুনতে পাই, সেটি হলো সময়ের সদ্ব্যবহার করতে শেখানো। বহু অভিভাবকেরই মত হলো, কোচিং সেন্টারে গেলে পড়াশোনার চাপ থাকবে, দিনের বড় একটা অংশ কোচিং সেন্টারে থাকতে হবে। ফলে, তাদের সন্তান খেলাধুলা, টিভি দেখা, আউট বই দেখা এমনকি ছোট ছোট বাচ্চারা বাসায় থেকে মাকে বাড়ির কাজে বিরক্ত করার সুযোগ পাবে না। এই অমানবিক সিদ্ধান্তটি শিশু অধিকারকে সরাসরি খর্ব করে, কিন্তু, দুঃখজনকভাবে আমরা সেই বিষয়েও সচেতন নই।

কোচিং সেন্টারের সফলতা অনেকাংশে মেকি। কারণ, মেধা জিনগত একটি বিষয়, যা শিশু ইনহেরিট করে এবং এটি মোটেও একপ্রকার নয়, বহুপ্রকার। কাজেই, যে শিশুটি জন্মগতভাবেই পড়াশোনায় মেধাবী সে স্বাভাবিকভাবেই অন্য সকলের তুলনায় একটু দ্রুত বুঝতে পারে। ফলে সে স্বাভাবিকভাবেই অন্যদের চেয়ে ভালো করে। এটা যদি কেবল সে স্কুল-কলেজে পড়ে তাহলেও প্রকাশ পাবে আবার পাশাপাশি কোচিং এ পড়লেও প্রকাশ পাবে, অর্থাৎ, এটা অবশ্যম্ভাবী। আর, এই সুযোগটিই নেয় কোচিং সেন্টার। যারা এমনিতেই ভালো তারা যথানিয়মে ভালো করে আর নামটি নেয় কোচিং সেন্টার। ফলে অভিভাবকেরাও কোচিঙের প্রতি আকৃষ্ট হন, কারণ, সবাই চান, তার সন্তানটিও যেন ভালো করুক। আর, স্কুল-কলেজ যখন তা নিশ্চিত করতে পারে না, তখনই তারা দারস্থ হন কোচিং সেন্টারের।

পড়াশোনার ব্যাপারটি হওয়ার কথা স্কুল-কলেজকেন্দ্রিক। বিকল্প কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কথা এখানে আসার কোনো সুযোগই নেই। কিন্তু, আমাদের দেশে তা হয় না। আমাদের দেশে স্কুল-কলেজের প্রতি বেশিরভাগেরই আস্থা নেই। উপরন্তু, দেখা যায়, স্কুল-কলেজই অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে ছুটির পরে কোচিং করাচ্ছে, কিংবা ঐসব স্কুল-কলেজেরই শিক্ষকবৃন্দ বাসায় প্রাইভেট পড়ানোর পসার বসিয়েছেন।

এবার একটু বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিঙের কথা বলা যাক। এই কোচিং সেন্টারগুলোর পলিসি অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে। তারা দাবি করে, দেশের শিক্ষাবিস্তারের ভার, আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যত নিশ্চিত করার ভার এবং শিক্ষার্থীদের মেধাবিকাশের ভার তারাই নিয়ে নিয়েছে এবং এজন্য তারাই সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান। স্কুল-কলেজের পড়াশোনায় এতদিন যেসব ঘাটতি ছিল, তারা সেগুলো এই চারমাসের মধ্যে পূরণ করে শিক্ষার্থীদের করে তুলবে প্রতিভাবান! এ কথাগুলো খুব কার্যকর হয়, কারণ, অসম্ভব প্রতিযোগিতার কারণে উচ্চ-মাধ্যমিক পরীক্ষার পর ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে সবাই খুবই অসহায় অবস্থায় পড়ে এবং অস্থির হয়ে ওঠে। এসব মরিয়া হয়ে ওঠা শিক্ষার্থী এবং অভিভাকেরা তখন হামলে পড়েন ভর্তি কোচিং সেন্টারের দ্বারে। সুদূর টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া- দেশের সবখানের আছে এসব কোচিং সেন্টার। তাছাড়া, সবাই বুভুক্ষের মতো চলে আসে ঢাকায়, বেশ কাঠখড় পুড়িয়ে ভর্তি হয় কোচিং সেন্টারে।

এসব কোচিং সেন্টার বলে থাকে, তারা শিক্ষার্থীর মেধাবিকাশে অত্যন্ত সচেতন। আর, এজন্য তাদের আছে এসি ক্লাশরুম, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া অভিজ্ঞ (!) শিক্ষক, আবাসন ব্যবস্থা, পরীক্ষা, ডিজিটাল রেজাল্ট পাবলিশিং সফটওয়্যার ইত্যাদি। আর, বিগত ১৪ বছরের পড়া চার মাসে গেলানোর জন্য তারা আবিষ্কার করেছে ‘স্পেশাল বটিকা’; যা গিলে ফেললেই প্রতিভার আভা চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে আর বটিকার জোরেই সে চান্স পেয়ে যাবে সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বলাই বাহুল্য, এই স্পেশাল বটিকা হলো ‘শর্টকাট সিস্টেম’ অর্থ্যাৎ, শর্টকাটে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, গণিত, জীববিজ্ঞান ইত্যাদি করার ‘ম্যাজিক্যাল সিস্টেম’। আর, এ সবই পাওয়া যাবে মাত্র ১০-১৪ হাজার টাকায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেতে যদি ১০-১৪ হাজার টাকা খরচ করতে হয়, তাহলে মোটামুটি অবস্থাসম্পন্ন পরিবার তা খরচ করতে দ্বিধাবোধ করে না। এমনকি, অসমর্থ পরিবারও ধার-দেনা করে যেভাবেই হোক, সন্তানের মঙ্গলের কথা ভেবে একটা ব্যবস্থা করেই ফেলে। অথচ, এসব গৎবাধা শর্টকাট মুলত মেধার বিকাশ নয়, বরং, প্রতিভা ধ্বংস করার একটা ভয়াবহ ষড়যন্ত্র, এটা তারা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেন না। আর, স্কুল-কলেজেই দীর্ঘ ১৪ বছরে যে ঘাটতি তৈরি হয় তার দায়ভারও কোচিং সেন্টার বা স্কুল-কলেজ বহন করে না। অর্থাৎ, শিক্ষার্থী সফল হলে কোচিং সেন্টার ও স্কুল-কলেজের ক্রেডিট আর ব্যর্থ হলেই সেই দায়ভার শিক্ষার্থীর। কী চমৎকার সিস্টেম!

আমাদের পড়াশোনার সবচেয়ে জনপ্রিয় কিছু শব্দ হলো, ‘ব্যাসিক, মুখস্থ, কমন, সাজেশন, হ্যান্ডনোট, গাইড, প্রাইভেট ও কোচিং সেন্টার’। বস্তুত, এই শব্দগুলো হলো পরীক্ষায় ভালো করার কী-ওয়ার্ড। উপর্যুক্ত শব্দগুলোর আলোকে যে যত বেশি আয়ত্ত করতে পারবে, সে পরীক্ষায় তত বেশি ভালো করতে পারবে এরকম একটি ধারণা আমাদের সকলের মাথায় বদ্ধমুল হয়েছে। এই কি-ওয়ার্ডগুলোর মধ্যে সৃষ্টিশীলতা, বিকাশ, প্রতিভা, আনন্দ, দক্ষতা, মূল্যায়ন- এসব শব্দ অনুপস্থিত। আর, এ অনুপস্থিতির জন্য দায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সিস্টেম তথা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা। এ শিক্ষাব্যবস্থা এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা যা শিক্ষার্থীদের কেবল চাপ দিতেই জানে এবং অত্যন্ত খোলামেলাভাবেই বিভিন্ন কোচিং, প্রাইভেট ও গাইডের ব্যবসাকে উৎসাহ দেয়। কাজেই, কোচিং সেন্টার, গাইড ব্যবসার জন্য প্রাথমিকভাবে দায়ী করা যায় শিক্ষাব্যবস্থাকেই।

কোচিং সেন্টারের এই ব্যবসা যে কতটা লাভজনক ও একে কেন্দ্র করে যে আরও কত ধরনের ব্যবসা গড়ে উঠেছে, তা কল্পনা করা যায় না। ঢাকার ফার্মগেট এলাকাটি পরিণত হয়েছে অ্যাডমিশন কোচিং, অ্যাকাডেমিক কোচিংসহ বিবিধ কোচিং সেন্টারের এলাকায়। যেদিকেই তাকানো যায় কেবল দেখা যায় কোচিং আর কোচিং। ভোর হতে না হতেই ঝাঁকে ঝাঁকে শিক্ষার্থী চোখ ডলতে ডলতে, ঝিমাতে ঝিমাতে, কাঁধে ব্যাগ নিয়ে মলিন মুখে আসা-যাওয়া করছে কোচিং সেন্টারে, চলছে সন্ধ্যা-রাত পর্যন্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য মৌসুমী এই শিক্ষার্থীর দল অত্যন্ত কষ্ট করে, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ছাত্রাবাসে কাটিয়ে দিচ্ছে দিনের পর দিন, খাচ্ছে নিম্নমানের খাবার। কোচিঙের ওপর আস্থাশীল লাখ লাখ শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকবৃন্দ। খু্বই অসুস্থ একটা সিস্টেমের কাছে তারা যে বন্দী, এই বিষয়টি বোঝার মতো ক্ষমতাও বোধহয় তারা হারিয়ে ফেলেছে।

শিক্ষার অবমূল্যায়নের কারণে এদেশের বেশিরভাগ অভিভাবক মনে করেন তাদের সন্তান ঢাকার কোনো নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুক। ডাক্তার এবং ইঞ্জিনিয়ার- এই দুটি বিষয় ছাড়া বাকিসব বিষয় ম্লেচ্ছ এমন একটি ধারণাও সবার মধ্যে দেখা যায়। আর, এই কারণেই অ্যাডমিশন কোচিংগুলোর এই রমরমা পসার। প্রতি বছর লাখ লাখ শিক্ষার্থী কেবল ঢাকায় আসে অ্যাডমিশন কোচিং করতে। এই কোচিং চলে ৩-৪ মাস বা তারও একটু বেশি। এই সময়টিকে তাদের থাকার জন্য চাই একটি আবাস। যাদের ঢাকায় থাকার কোনো যায়গা নেই, তারা পড়ে যায় বিরাট সমস্যায়। এই সমস্যাটিকে ব্যবহার করে গড়ে উঠেছে ছাত্রাবাস। এসব ছাত্রাবাসগুলো মূলত মানুষ বাসের অনুপযোগী। ছোট ছোট একেকটা কামরাতে থাকতে হয় তিনজন। জড়সড় করে লাগানো চৌকি ও তার সাথেই লাগোয়া পড়ার টেবিল। এদিকে লোডশেডিং, চারিদিকে ময়লা-আবর্জনা দুর্গন্ধের সঙ্গে আরেক মাত্রা যোগ করে অস্বাস্থ্যকর খাবার। এতসব সমস্যার মধ্যে একজন শিক্ষার্থীর পড়াশোনায় মনোনিবেশ করা একটা অসম্ভব ব্যাপার। এসব ছাত্রাবাসে থাকার ব্যয়ও নেহাত কম নয়। ফি-মাস ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা লাগে এরকম একটি আশ্রয় পেতে। সাথে কোচিং সেন্টারগুলোর ভর্তি ফিও কম নয়। সেইসাথে আনুষঙ্গিক খরচ তো থাকেই। কাজেই, আমরা দেখছি, এই অহেতুক চাপ, দুশ্চিন্তা এবং ভয়াবহ জীবন মূলত একটি কৃত্রিম সমস্যা। এটি হতোই না, যদি আমরা আমাদের নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা খাটিয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে পারতাম।

ঢাকা শহরের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে আসা শিক্ষার্থীর সংখ্যা লাখ লাখ। কিন্তু, এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন সংখ্যা তার তুলনায় এতই নগণ্য যে, প্রবাবিলিটির হিসাবে একজন শিক্ষার্থী এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাবার সম্ভাব্যতা ০.০০১-এর কাছাকাছি। অর্থাৎ, এ কথা কোনো কোচিং সেন্টার নিশ্চিতভাবে বলতে পারবে না যে, তাদের কোচিঙে পড়লেই কেউ কাঙ্খিত বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাবেই। অথচ, তারা এ কথাটিকেই অত্যন্ত সুকৌশলে ব্যবহার করে প্রতি বছর লাখ লাখ শিক্ষার্থীকে অর্থের বিনিময়ে ভর্তি করায়। কেউ অকৃতকার্য হলে সেই দায়ভারও তাদের ওপর বর্তায় না, কারণ, ব্যর্থতার ভার সবসময় শিক্ষার্থীর ওপর পড়বে- এটাই আমাদের মজ্জাগত সেই ১৪ বছর আগে থেকেই। কাজেই, কৃত্রিম প্রতিযোগিতা তৈরি করতেই মূলত কোচিং সেন্টারগুলো সংকল্পবদ্ধ- এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। তবুও, আমাদের লাখ লাখ শিক্ষার্থী এটার ওপর নির্ভরশীল, তাদের অভিভাবকেরাও এটার প্রতি আস্থাশীল একটাই কারণে, এরা আন্তরিক। অর্থাৎ, এদের মান যতটা না উন্নত, তার চেয়ে এরা আন্তরিকতা বেশি প্রদর্শন করে এবং মানুষকে ইমোশনালি ব্ল্যাকমেইল করে থাকে।

কোচিং সেন্টার থেকে যারা ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পায়, তাদের ভালো করার পেছনে খুব সামান্য কৃতিত্বই থাকে কোচিং সেন্টারের। কারণ, যেখানে অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী তাদের পড়ার গতির সাথে তাল ধরেই রাখতে পারে না, সেখানে যারা চান্স পায় তারা যদি সত্যিকারই মেধাবী না হয়ে থাকে তাহলে টিকে থাকা মুশকিল। আর, মেধার বিকাশ নিশ্চয়ই কোচিং সেন্টার ঘটায় নি, কারণ, তারা অনেক আগে থেকেই মেধাবী। সুতরাং, একজনের সাফল্যের পেছনে ভর্তি কোচিংকে কতটুকু কৃতিত্ব দেয়া যেতে পারে, সেই বিবেচনা পাঠকদের হাতেই ছেড়ে দেয়া হলো।

ইয়ামিন রহমান ইস্ক্রা: আইন বিভাগ, ১ম বর্ষ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী, বাংলাদেশ।

Previous articleযোগ্য শিক্ষার্থীরা ব্রিটেনে পড়ালেখার সুযোগ পাবে আবারও
পরবর্তী লেখাটেলিভিশন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিজ্ঞান শিক্ষা জনপ্রিয়করণ: একটি প্রস্তাবনা
গৌতম রায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে শিক্ষায় স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে শিক্ষা-গবেষক হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেন ব্র্যাকের গবেষণা ও মূল্যায়ন বিভাগে। পরবর্তীতে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-এ যোগ দেন গবেষণা ও মূল্যায়ন সমন্বয়ক হিসেবে। সেখান থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে শিক্ষকতা পেশায় আসেন। তিনি আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ও পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট উভয় পর্যায়ে শিক্ষা-গবেষণার সাথে সম্পর্কিত কোর্সসমূহ যেমন—শিক্ষায় গবেষণা পদ্ধতি, শিক্ষায় মূল্যায়ন ও পরিমাপ, শিক্ষায় কর্মসহায়ক গবেষণা, শিক্ষা গবেষণায় পরিসংখ্যান ইত্যাদি কোর্সসমূহ পড়াচ্ছেন। পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষা বিষয়ে বিভিন্ন গবেষণার সাথেও যুক্ত রয়েছেন। গবেষক হিসেবে তিনি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা, শিক্ষায় মূল্যায়ন পদ্ধতি, শিক্ষা ও আইসিটি, কমিউনিটির সম্পৃক্ততা, শিক্ষায় প্রবেশগম্যতা, শিক্ষা প্রকল্প মূল্যায়ন ইত্যাদি বিষয়ে ৩০টিরও বেশি গবেষণা প্রজেক্টের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শিক্ষা-বিষয়ে তাঁর একাধিক গবেষণাভিত্তিক প্রবন্ধ বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে এবং একাধিক বই প্রকাশিত হয়েছে। শিক্ষা-বিষয়ে নিয়মিত লিখছেন বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও অনলাইন মিডিয়ায়। তিনি ‘বাংলাদেশের শিক্ষা’ ওয়েবসাইটের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here