বাংলাদেশের শিক্ষা - ছোট
বাংলাদেশের শিক্ষা - ছোট


শেখ শাহবাজ রিয়াদ: শিক্ষাবিজ্ঞানের পরিভাষায় শিক্ষা বলতে অভিজ্ঞতা ও অনুশীলনের মাধ্যমে জ্ঞান, দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক, কল্যাণমূলক পরিবর্তন বুঝায়। আবার জ্ঞান, দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক পরিবর্তনকে সামগ্রিকভাবে আচরণের পরিবর্তন বলে। যার কারণে শিক্ষাকে আচরণের ইতিবাচক পরিবর্তন বলে অভিহিত করা হয়। অন্যদিকে শিখন, শিক্ষণ ও প্রশিক্ষণ হচ্ছে শিক্ষাবিজ্ঞানের বিভিন্ন পরিভাষা যেগুলো শিক্ষাসমার্থক এবং যার মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের জ্ঞান, দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করা এবং শেখানোর কাজ সম্পন্ন হয়।

সাধারণত শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক কর্তৃক শিক্ষার্থীদের প্রতি বিভিন্ন বিষয়ে পাঠদান করা হয় এবং আশা করা হয় যে, এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ধরনের জ্ঞান, দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করবে। এক্ষেত্রে শেখানোর কাজটি শিক্ষকের এবং শেখার কাজটি শিক্ষার্থীর। শেখানোর এ প্রক্রিয়াটি শিক্ষককেন্দ্রিক পদ্ধতি হিসেবে পরিচিত। সারা পৃথিবীতেই প্রাচীনকাল থেকে শিক্ষককেন্দ্রিক পদ্ধতি চলে এসেছে। শিক্ষককেন্দ্রিক পদ্ধতির বিভিন্ন কৌশল আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহ্নত ও জনপ্রিয় শিক্ষককেন্দ্রিক পদ্ধতি হচ্ছে বক্তৃতা পদ্ধতি। বক্তৃতা পদ্ধতি এমন একটি পদ্ধতি যে ক্ষেত্রে মৌখিক বিবৃতির সাহায্যে শিক্ষণীয় বিষয়বস্তু শিক্ষার্থী কাছে উপস্থাপন করতে হয়। এখানে শিক্ষকের বক্তৃতাদানের পারদর্শিতা তথা বাগ্মিতা গুণ, বক্তৃতাদানের কলাকৌশল, বিষয়বস্তুকে শিক্ষার্থীর নিকট হৃদয়গ্রাহী করে তোলার ক্ষমতা ইত্যাদির ওপর শিক্ষাদানের সার্থকতা অনেকাংশে নির্ভর করে। বাচনিক তৎপরতার মাধ্যমে বিষয়বস্তুর বিস্তৃত বর্ণনা এবং ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা এ পদ্ধতির প্রধান বৈশিষ্ট্য।

এই পদ্ধতির ক্ষেত্রে ভাববাদী দর্শন কাজ করে। অর্থাৎ শিক্ষক বা গুরুই সবকিছু জানেন, শিক্ষার্থী বা শিষ্য কিছুই জানে না। শিক্ষকের মাথা জ্ঞান ও অভিজ্ঞতায় পূর্ণ, অন্যদিকে শিক্ষার্থীর মাথা একেবারেই শূন্য। শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের বিশাল ভাণ্ডার থেকে প্রদত্ত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনবে এবং তার জ্ঞানের খালি মগটি পূর্ণ করে নিবে। এটি শিক্ষাবিজ্ঞানে বহুল প্রচলিত জগ-মগ তত্ত্ব (Jug and Mug Theory) নামে পরিচিত। কিন্তু আধুনিক শিক্ষাদর্শন ও শিক্ষা মনোবিজ্ঞান ‘জগ-মগ তত্ত্ব’কে  সমর্থন করে না।

প্রকৃতিবাদী, প্রয়োগবাদী ও বাস্তববাদী দার্শনিকগণ মনে করেন, কোনো শিশুই জ্ঞান বা অভিজ্ঞতায় খালি বা শূন্য নয়। যেকোন বয়সের হোক না কেন, শিশু কিছু না কিছু অভিজ্ঞতা, দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। শিক্ষার্থীর মেধাকে স্বীকৃতি দিয়ে উনিশ শতকের শুরু থেকে শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, শিশু-কেন্দ্রিক শিক্ষার প্রচলন শুরু হয়। বর্তমানে শিক্ষাক্রম, পাঠ্যসূচি সবকিছুই শিশু বা শিক্ষার্থীকে কেন্দ্র করে প্রণীত। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্য হল শিশুর সক্রিয়তা, কর্মকেন্দ্রিকতা, সামর্থ্য ও আগ্রহকে কাজে লাগানো। সুতরাং বলা যায়, শিক্ষার্থীর দৈহিক মানসিক সামর্থ্য, বুদ্ধি, আগ্রহ, মনোযোগ অবসাদ ইত্যাদি বিবেচনা করে শিখন-শেখানো কার্যক্রমের মাধ্যমে শিখন ফল অর্জনের জন্য শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক অংশগ্রহণমূলক বা কৌশল পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। অবশ্য ভারত উপমহাদেশে ইংরেজ শাসনামলে পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের আগে যে টোল, মক্তব, মাদ্রাসাভিত্তিক দেশীয় শিক্ষা চালু ছিল তাতে সাধারণত একজন শিক্ষকই একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতেন। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের অপ্রতুলতার কারণে উচ্চশ্রেণির যোগ্য শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে কাউকে কাউকে দিয়ে অপেক্ষাকৃত নিচের শ্রেণিতে শিক্ষাদানের কাজ পরিচালনা করা হত। এই ধরনের শিক্ষাদান পদ্ধতিকে সর্দার-পড়ো ব্যবস্থা নামে অভিহিত করা হতো। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম শৈশবে তাঁর বাবার মক্তবে এ ধরনের শিক্ষক ছিলেন।

দেশীয় শিক্ষার এরকম পদ্ধতি ইংল্যান্ডের শিক্ষাবিদ এন্ড্রু বেল (১৭৫৩-১৮৩২) এবং জোসেফ লেনকাস্টারকে (১৭৭৮-১৮৩৮) গভীরভাবে প্রভাবিত করে। এন্ড্রু বেল মাদ্রাজের একটি তামিল স্কুলে সর্বপ্রথম এ পদ্ধতির প্রয়োগ দেখতে পান। পরে তাঁদের নিজস্ব চিন্তা ও প্রজ্ঞা দিয়ে ইংল্যান্ডের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে এ পদ্ধতি নতুন করে প্রবর্তন করেন, যা মনিটারিয়েল সিস্টেম বা বেল-লেনকাস্টার পদ্ধতি নামে  সারা পৃথিবীতে সুপরিচিত। মূলত শিক্ষকস্বল্পতা ও অধিক সংখ্যক শিক্ষার্থীর ক্লাস সফল ও কার্যকরভাবে পরিচালনার সুবিধার্থে এ পদ্ধতির প্রয়োগ করা হয়। শিক্ষার্থীদেরকে দিয়ে ক্লাস নেওয়ানোর কার্যকারিতা সর্দার-পড়ো ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সাম্প্রতিককালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং তৃতীয় বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে এই ধরনের শিক্ষাদান ব্যবস্থা সার্থকতার সাথে বাস্তবায়িত হচ্ছে।

বাংলাদেশের মতো বৃহৎ শিক্ষাব্যবস্থা যেখানে, সেখানে উপযুক্ত শিক্ষকের প্রয়োজনীয়তা ও পর্যাপ্ত শিক্ষকের অভাব বরাবরের মতো চলে এসেছে, সেখানে শিক্ষার্থীকে শ্রেণি-কার্যক্রমে শিক্ষকের পাশাপাশি কাজে লাগানো ফলপ্রসু হওয়া বেশ সম্ভাবনাময় । কারণ প্রাথমিকের প্রায় তিন কোটি ও মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রায় দুই কোটি শিক্ষার্থীর জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষকের নিয়োগ দেওয়া সহজ কাজ নয়। শিক্ষাক্ষেত্রকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েও তা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে দেখা যায় যে, প্রায় প্রতিটি স্কুলেই কোনো কোনো বিষয়ের শিক্ষক স্বল্পতা আছেই। সেক্ষেত্রে বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা উপযুক্ত তাদের দিয়ে বিভিন্ন বিষয়ের ক্লাস নেওয়ানোর সংস্কৃতি প্রবর্তন করার উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে প্রতিটি বিদ্যালয়ে সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের একটি প্যানেল তৈরি করা যেতে পারে।

সাবেক শিক্ষার্থীরা তাদের অবসরে ক্লাস নিবেন, অভিজ্ঞতা বিনিময় করবেন, সফলতার কাহিনী শুনিয়ে উদ্দীপিত করবেন, জীবনযুদ্ধের কাহিনী শুনিয়ে সাহসী ও আত্মবিশ্বাসী করবেন। কারণ আমরা জানি, শিক্ষা শুধু জ্ঞান অর্জনই নয়, মূল্যবোধ শেখানো, আত্মাবশ্বাসী করানো, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গঠন এবং দেশ ও সমাজের প্রতি কর্তব্যবোধে উৎসাহিত করানোও শিক্ষার কাজ। অন্যদিকে কোনো বিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা উচ্চ মেধাবী, দুরদর্শী ও কর্মঠ, তাদেরকে দিয়ে ক্লাস নেওয়ানোর মতো কাজ করালে তা ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে।

বর্তমানে শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক অংশগ্রহণমূলক বিভিন্ন কৌশল যেমন, দলীয়কাজ, সতীর্থ শিখননহ অন্যান্য পদ্ধতি ও কৌশলে শিক্ষকের চেয়ে সক্রিয় ও মেধাবী শিক্ষার্থীর ভূমিকা কম নয়। কারণ ৫/৬ জনের একটি দল গঠন করলেই দলীয় কাজ সম্পাদন ও উপস্থাপন কার্যকর হয় না, যদি না দলীয় নেতা সবাইকে সক্রিয় রাখতে ভূমিকা রাখেন। ফলে এ দৃষ্টিকোণ থেকেও শ্রেণি কার্যক্রমে ও শিখন অর্জনে শিক্ষার্থীদের গুরুত্ব লক্ষ্য করা যায়।

আমরা জানি, কোনো একটি শ্রেণিতে যেমন কিছু কম মেধাবী শিক্ষার্থী থাকে, তেমনি কিছু শিক্ষার্থী থাকে যারা বেশ উচ্চ মেধার অধিকারি। উচ্চ-মেধাবী শিক্ষার্থীদেরকে গড় মেধাবী ও কম মেধাবীদের সাথে শিক্ষাদান করা একীভূত শিক্ষণ-শিখনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলেও মেধাবী শিক্ষার্থীদের সত্যিকার ও উপযুক্ত বিকাশ ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এরকম পরিবেশে তারা বেশ কিছু সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকে। যেমন, ক্লাসের প্রতি অনাগ্রহ, অমনোযোগিতা, আন্তঃব্যক্তিক সর্ম্পকে টানাপোড়েন ও ভুলবুঝাবুঝি, নিজেকে গুটিয়ে রাখা, শিক্ষকের ত্রুটি ধরার মানসিকতা ইত্যাদি। এরূপ অবস্থায় ক্লাসের মেধাবীদেরকে শ্রেণি কার্যক্রমে কোনো না কোনোভাবে জড়িত করাই যুক্তিযুক্ত হবে। এতে তাদের শিক্ষা ও শিখনের প্রতি আগ্রহ ও আকর্ষণ বৃদ্ধির সাথে সাথে মেধার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করার সুযোগ ঘটবে। শিক্ষা মনোবিজ্ঞান অনুযায়ী এ বয়সের শিক্ষার্থীরা নিজেদেরকে প্রকাশ করতে চায়। তাদের ভেতরের সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে কাজে লাগাতে চাইলে তাদেরকে কোনো না কোনোভাবে সক্রিয় রাখতে হবে ক্লাসে।

তবে শিক্ষার্থীদের দিয়ে ক্লাস নেওয়ানোর সফলতা নির্ভর করে বেশ কয়েকটি প্রেক্ষাপট ও অবস্থানের ওপর। শিক্ষককে শিক্ষার্থীদের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাবের হতে হবে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে গ্যাপ থাকলে শিক্ষার্থীদেরকে দিয়ে এরকম কাজ সফলভাবে করানো যায় না। শিক্ষক কী উদ্দেশ্যে, কেন মেধাবী শিক্ষার্থীকে ক্লাস নেয়ানোর মতো কাজে ব্যবহার করছে তা শ্রেণির সকল শিক্ষার্থীর নিকট পরিস্কার থাকতে হবে। শিক্ষার্থীরা যদি মনে করে, শিক্ষক নিজের শ্রম ও কাজের চাপ কমানোর জন্যে শিক্ষার্থীকে ব্যবহার করছে, তাহলে উল্টো ফল আসতে পারে। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও এতে ভুল বুঝতে পারেন। অভিভাবকদের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হতে পারে। যে সকল মেধাবী শিক্ষার্থী শিক্ষককে শ্রেণি কার্যক্রমে সাহায্য করবেন তাদের কাছেও বিষয়টি পরিস্কার হতে হবে। তারা যেন মনে না করে শিক্ষক তাদেরকে ব্যবহার করছেন। এ সকল নেতিবাচক দিক মোকাবেলা করতে পারলে শিক্ষার্থীদের দিয়ে ক্লাস নেওয়ানো বিদ্যালয়ের মানবিক সম্পদের যথার্থ ব্যবহারের একটি বড় ধরনের সূযোগ হতে পারে।

বর্তমানে শিক্ষণ-শিখন পদ্ধতিতে এসেছে নানা পরিবর্তন। আইসিটিনির্ভর শিক্ষণ-শিখন পদ্ধতি ও কৌশল ব্যবহার হচ্ছে শ্রেণিকক্ষে। আমাদের মাধ্যমিক পর্যায়ের ২০,৫০০ বিদ্যালয়ে একটি করে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম তৈরি করা হয়েছে। কারিকুলাম প্রণীত হচ্ছে শিক্ষার্থীর চাহিদা, প্রয়োজনীয়তা ও অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ চলছে জোরেসোরে। এ সকল প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, অনেক সময় প্রশিক্ষক থেকে প্রশিক্ষণার্থীদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা বেশি থাকে। আবার উল্টো চিত্রটি চোখে পড়ে। আইসিটির প্রাথমিক ধারণা নেই এমন শিক্ষকরা ডিজিটাল কন্টেন্ট প্রশিক্ষণে চলে আসেন। ফলে এ রকম অসম প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকে সফলভাবে পরিচালনা করতে প্রশিক্ষকগণকে একই প্রশিক্ষণে আসা অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাসম্পন্ন প্রশিক্ষণার্থীদের সাহায্য নিতে হয়। এক্ষেত্রে যারা একেবারেই নতুন তাদেরকে বেশ ভালো জানেন এমনদের সাথে জুটি বেধে দেওয়া হয়। দেখা গেছে, অগ্রসর সহপাঠীর সহযোগিতায় এবং প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে ১৪ দিনে বেশ সফলতার স্বাক্ষর রেখেই প্রশিক্ষণ শেষ করতে পারছে।

এভাবে শিক্ষার্থীদের সাহায্য নিয়ে সফল শিখন কার্যক্রম পরিচালনার করার আরো নজির দেয়া যেতে পারে। শিক্ষকের কাছে লজ্জ্ব-দ্বিধা ও ভয়ে যা বলতে পারে না, সে সকল দুর্বল ও লাজুক শিক্ষার্থীরা দলীয় কাজ করার সময় সহপাঠীদের নিকট নিজের অপারগতা, অক্ষমতা প্রকাশ করে যেভাবে উপকৃত হতে পারে, শিক্ষক থেকে সরাসরি তা পাওয়া যায় না।

যে কোন বিদ্যালয়ের ক্রীড়া শিক্ষক থেকে সাধারণত সে বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীরা বেশী ফুটবল, ক্রিকেট, সাতাঁর ও অন্যান্য খেলায় পারদর্শী হয়। কারণ শুধু তত্ত্বীয় জ্ঞান দিয়ে খেলাধুলা পরিচালনা করা যায় না। সে ক্ষেত্রে দুরদর্শী শিক্ষক তাঁর দক্ষ ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন শিক্ষার্থীকে দলনেতা ও সহকারী প্রশিক্ষকের দায়িত্ব দিয়ে করে সফলভাবে খেলাধুলার ক্লাস ও মাঠের খেলাধুলা পরিচালনা করতে পারেন। বরং এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদেরকে সুযোগ না দিলে শিক্ষার তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক শিখন ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ কোনো অবস্থাতেই শিক্ষার্থীকে নিষ্ক্রিয় রেখে সফল শিক্ষণ-শিখন কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব নয়। তাই শিক্ষার্থীদেরকে শিখন-শেখানো কার্যক্রমে ভিন্নমাত্রায় উপস্থাপন করতে পারলে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে, যা বিশ্বে অন্যান্য দেশের জন্য অনুকরণীয় হতে পারে।

শিক্ষার্থীদেরকে দিয়ে ক্লাস নেওয়ানোসহ শিখন-শেখানোর বর্তমান ধারায় আরও সক্রিয়ভাবে কাজে লাগানোর যৌক্তিকতাকে মেনে নিয়ে এর একটি পরিকল্পনা এখানে তুলে ধরতে চাই। তা হলো, বিদ্যালয়ভিত্তিক ‘শিক্ষার্থী রিসোর্স টিম’ গঠন করা। এ টিমের অর্ন্তভুক্ত হবে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ বিভিন্ন বিভাগের সেরা শিক্ষার্থীরা। এ ধরনের টিম হতে পারে উপজেলাভিত্তিকও। যে টিমের অর্ন্তভুক্ত হবে এসএসসি ও এইচএসসি পর্যায়ের বিভিন্ন বিভাগের সেরা শিক্ষার্থীরা। প্রতিটি বিদ্যালয় তাদের শিক্ষার্থীদের মনোনয়ন দিবে। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট না হওয়া পর্যন্ত উপজেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে বিভিন্ন ক্লাসে তারা শিক্ষাদান করে যাবে। এটিই হবে তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতার অনুশীলন। ‘শিক্ষার্থী রিসোর্স টিম’কে জাতীয় রূপ দেবার সুযোগও আছে। প্রতি বছর এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা যে লক্ষাধিক শিক্ষার্থী জিপিএ ৫ পাচ্ছে তাদেরকে নিয়ে ‘জাতীয় শিক্ষার্থী রিসোর্স টিম’ গঠন করা যেতে পারে। সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া গেলে সুবিধামত সময়ে তারা তাদের নিজ নিজ কিংবা পার্শ্ববর্তী প্রতিষ্ঠানে এক বা দুই মাসের জন্য শিক্ষণসেবা প্রদান করতে পারে। সামান্য প্রশিক্ষণ দেয়া গেলে তাদের মধ্যে আমরা ভবিষ্যতের সেরা শিক্ষকদের খুঁজে পেতে পারি। আমাদের খুদে শিল্পীরা যখন বড়দের কঠিন গানটি গেয়ে স্বয়ং শিল্পীকে মুগ্ধ করে দেয়, যখন শিক্ষার্থীদের মিনি পার্লামেন্ট বিতর্ক শুনে দেশের ঝানু ঝানু সাংসদ ও মন্ত্রীগণ মুগ্ধ হয়ে যান, তখন আশা জাগে আমাদের শিক্ষার্থীদেরকে শিক্ষক হবার সুযোগ দিলে তাদের সুপ্ত প্রতিভার প্রকাশ ঘটবে এবং জাত শিক্ষকের সন্ধান পাব। কারণ জন্মগত শিক্ষক চিহ্নিত করার কোনো প্রয়াস আজও আমাদের দেশে পরিলক্ষিত হয়নি। আমাদের দেশে যা চালু আছে তা হলো যারা ঠেকে শিক্ষকতায় আসেন তাদেরকে দায়সারা প্রশিক্ষণ দিয়ে শিক্ষক হিসেবে চালিয়ে দেবার সংস্কৃতি। এ কথা মনে রাখতে হবে যে, বর্তমানে আমাদেরকে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যগত, অর্থগত ও রেজাল্টগত দৈনতা নেই। আজকাল পরীক্ষা দিতে পারলেই ভালো ফলাফলের আশা করা যায়। কারণ শিক্ষার্থীরা আত্মবিশ্বাসী এবং শিক্ষকগণ উদার। আমাদের শিক্ষার্থীদের যে বিষয়টির অভাব আছে তা হলো মূল্যবোধের। নম্বরমুখী মূল্যায়ন ব্যবস্থার কারণে শিক্ষার্থীদের মূল্যবোধ চর্চার সযোগ নেই। এমন সংস্কৃতি হয়েছে যে, শিক্ষার্থীরা তাদের ভেতরের প্রতিভাকে আবিষ্কার করার সুযোগই পায় না, অনুশীলন তো দুরের কথা।

সর্বোপরি শিক্ষাক্রমে বর্ণিত ‘শিখন-কৌশল কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদেরকে সৃজনশীল করা অর্থাৎ বিশ্লেষণমূলক, চিন্তা উদ্দীপক ও সৃজনশীল প্রশ্নোত্তর ও কাজ অনুশীলনের মাধ্যমে সৃজনশীল ও উদ্ভাবনী ক্ষমতার বিকাশের সুযোগ প্রদানের’ যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে তা যথার্থ অর্থে অর্জনের জন্যও ক্লাস নেয়ানোসহ বিভিন্ন সৃজনশীল কাজে ‘শিক্ষার্থী রিসোর্স টিম’ ধারণাকে ব্যবহার করা যেতে পারে। কারণ আমাদের মনে রাখতে হবে ‘রির্সোস মবিলাইজেশন’ বা সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারই বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক ও পুজিঁবাদী সমাজ ব্যবস্থায় টিকে থাকার অন্যতম উপায়।

শেখ শাহবাজ রিয়াদ: সহকারী অধ্যাপক, সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, ঢাকা, বাংলাদেশ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here