বাংলাদেশের শিক্ষা - ছোট
বাংলাদেশের শিক্ষা - ছোট


গৌতম রায়: কয়েক বছর ধরে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর দৈনিক পত্রিকাগুলো নানা ধরনের বিশ্লেষণ প্রকাশ করছে। পত্রিকাগুলোর এই ধারা তুলনামূলকভাবে নতুন এবং প্রশংসাযোগ্য। শুধু পত্রিকার সাংবাদিকরাই যে বিশ্লেষণগুলো করছে তা নয়; বরং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণী লেখাও তারা একই সাথে প্রকাশ করছে। কোন বছর কী কারণে ফলাফল ভালো বা খারাপ হলো, সেই বিশ্লেষণ তো থাকেই; পাশাপাশি ছেলে ও মেয়েদের ফলাফল আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা হয়। এতে সার্বিক ফলাফল সম্পর্কে একটি তুলনামূলক চিত্র পাওয়া যায়।

সংবাদপত্রের এসব বিশ্লেষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো- দেশে যে বিজ্ঞান শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে, সেটি পত্রিকাগুলোর বিশ্লেষণের মাধ্যেমই প্রথম গুরুত্বসহকারে আলোচনায় উঠে আসে। আগের বছরগুলোর এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ও তাদের পাশের হার বিবেচনা করে বিজ্ঞানের প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ যে দিন দিন কমছে, সেটি এসব বিশ্লেষণ থেকে পরিষ্কার। সম্প্রতি বাংলাদেশ ফ্রিডম ফাউন্ডেশন পরিচালত এক গবেষণা থেকেও এর সত্যতা মিলেছে। গবেষণা থেকে দেখা যায়, গত এক দশকে দেশে বিজ্ঞান শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ৩১ ভাগেরও বেশি। বিষয়টি যথেষ্ট উদ্বেগজনক। কারণ বাংলাদেশে বিজ্ঞান শিক্ষার্থীর সংখ্যা কোনোকালেই বেশি ছিল না। এর মধ্যে যদি শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরো কমতে থাকে, তাহলে ধরে নিতে হবে মেধাবী শিক্ষার্থীরা এখন আর বিজ্ঞানের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে না। একটি দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী না থাকলে ভবিষ্যতে সেই দেশ বেশি দূর অগ্রসর হতে পারে না।

এটা ঠিক, বাংলাদেশে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা পর্যায়ে কী পরিমাণ বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী থাকা দরকার, সেরকম নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। দেশের চাকুরি বাজারে বিজ্ঞান ব্যাকগ্রাউন্ডের কী পরিমাণ শিক্ষার্থী প্রয়োজন হয় প্রতি বছর- সেরকম কোনো তথ্যও নেই। বিভিন্ন পর্যায়ে খোঁজখবর নিয়ে এ সংক্রান্ত কোনো তথ্য জানা যায় নি। কোনো গবেষণা প্রতিবেদনেরও দেখা মেলে নি। অথচ দেশের চাকুরির বাজারকে যথাযথভাবে কার্যকর রাখতে এই হিসাবনিকাশগুলো জানা থাকা খুবই জরুরি। সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশেও দক্ষ কর্মীদের কদর বাড়ছে। সেখানেও কী পরিমাণ জনবলের বিজ্ঞান ব্যাকগ্রাউন্ড থাকা দরকার, সেরকম কোনো তথ্য নেই। দেশে চাকুরিদাতাদের অনেকেই অভিযোগ করেন যে, তারা তাদের প্রয়োজন অনুসারে দক্ষ কর্মী পান না। অপরদিকে বিপুল সংখ্যক গ্র্যাজুয়েট বেকার থাকছে কিংবা কম যোগ্যতার চাকুরি করছে। এই চাহিদা ও যোগানের পার্থক্যের কারণ সম্ভবত কোন ব্যাকগ্রাউন্ডের কী পরিমাণ দক্ষ জনবল প্রয়োজন হবে, সেই বিশ্লেষণের অভাব।

গবেষণা থেকে এখন এটা পরিষ্কার যে, বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী কমছে প্রতিবছর। তাহলে এই শিক্ষার্থীরা যাচ্ছে কোথায়? যাওয়ার জায়গা মূলত দুটো- মানবিক বিভাগ ও বাণিজ্য বিভাগ। পত্রিকাগুলোর বিশ্লেষণ থেকে এটিও উঠে এসেছে যে, প্রতি বছর বিজ্ঞান বিভাগে যে পরিমাণ শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ার কথা, তারা দিন দিন বিজ্ঞানের বদলে বাণিজ্য বিভাগে ঝুঁকছে। সাধারণত ক্লাসের অপেক্ষাকৃত মেধাবী শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান বিভাগ বেছে নেয়। এরপর যাদের গণিত সম্পর্কে ভীতি তুলনামূলকভাবে কম, তারা বাণিজ্য বিভাগে যায় এবং বাদবাকি শিক্ষার্থীরা নবম শ্রেণীতে মানবিক বিভাগকে বেছে নেয়। দেশে মানবিক বিভাগের চিত্রটা খুব একটা বদলায় নি, যতোটুকু বদলেছে বিজ্ঞান ও বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষার্থীর সংখ্যা।

প্রশ্ন হলো, শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞানের বদলে বাণিজ্যে ঝুঁকছে কেন? বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের বিভাগ ঠিক করতে হয় নবম শ্রেণীতে। খুব কম শিক্ষার্থীই নিজ ইচ্ছায় বিভাগ বাছাইয়ের কাজটি করতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে হয় তাদের অভিভাবক কিংবা শিক্ষকরা বাছাই করে দেন। শিক্ষার্থী নিজ আগ্রহে বিভাগ বাছাই করবে- এটি সর্বোত্তম পন্থা হওয়া উচিত হলেও শিক্ষকরা সাধারণত নিজ থেকেই ক্লাসের মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানে ভর্তি করিয়ে দেন। সাম্প্রতিক সময়ে অভিভাবকরা তুলনামূলকভাবে সচেতন হওয়ায় বিভাগ বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তাদের সম্পৃক্ততা বেড়েছে তুলনামূলকভাবে বেশি।

তার মানে, বিভাগ বাছাইয়ের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সম্পৃক্ততা বাড়ছে। ফলে ধরে নেয়া যায়, তারা নিজ আগ্রহেই বিজ্ঞানের বদলে বাণিজ্য বিভাগ বেছে নিচ্ছে। নবম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় সাধারণত একজন শিক্ষার্থীর দেশের চাকুরি বাজার কিংবা ভবিষ্যত রূপরেখা সম্পর্কে পরিষ্কার আইডিয়া থাকে না। অভিভাবক বা শিক্ষকরা এক্ষেত্রে তাদের প্রভাবিত করেন বেশি। অপরদিকে শিক্ষার্থীরা সিদ্ধান্ত নেয় তাৎক্ষণিক সুবিধা-অসুবিধা দেখে। এখন একজন শিক্ষার্থী যখন দেখবে তার বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান বিভাগের জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, দক্ষ শিক্ষক নেই, কোনো ল্যাবরেটরি নেই, তখন শিক্ষার্থী স্বাভাবিকভাবেই বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হতে চাইবে না। অথচ আমাদের দেশের অধিকাংশ বিদ্যালয়ের চিত্রই এটি। মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে খুব কমই বিজ্ঞান শিক্ষক আছেন যারা শিক্ষার্থীদেরকে আনন্দজনকভাবে বিজ্ঞানের বিষয়গুলো পড়াতে পারেন। ফলে তাদেরকে দেখে শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান বিভাগ নেওয়ার কোনো কারণ নেই। অপরদিকে খুব কম বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান বিভাগের জন্য আলাদা ল্যাবরেটরি আছে। যেসব বিদ্যালয়ে আলাদা ল্যাবরেটরি রয়েছে সেখানে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও উপকরণের অভাব রয়েছে। আবার এগুলো থাকলেও হয়তো দেখা যায় সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞান শিক্ষক ঠিকমতো ল্যাবরেটরি ক্লাস নিতে পারেন না। মাধ্যমিক পর্যায়ের বিজ্ঞান বইগুলোতে যেসব ল্যাবরেটরিভিত্তিক পরীক্ষার কথা বলা হয়েছে, সেগুলো যথাযথভাবে করা হয় এমন বিদ্যালয় খুব কমই আছে দেশে। ফলে বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান শিক্ষার এসব বেহাল দশা দেখে শিক্ষার্থীদের বিষয় হিসেবে বিজ্ঞানকে বেছে নেওয়ার কোনো কারণ আছে বলে মনে হয় না।

বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার খরচও তুলনামূলকভাবে বেশি। প্রথমত, বিদ্যালয়ে ঠিকমতো পড়াশোনা না হওয়ায় এবং প্রাইভেট পড়ার সংস্কৃতি দিন দিন প্রবল হওয়ায় শিক্ষার্থীদের পদার্থ, রসায়ন ও জীববিজ্ঞান সবগুলো বিষয়েই প্রাইভেট পড়তে হয়। সাথে গণিত তো রয়েছেই। এছাড়া প্র্যাকটিক্যাল বই, খাতা ও অন্যান্য উপকরণ কিনতে হয়। বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা ফি এবং রেজিস্ট্রেশন ফি-ও তুলনামূলকভাবে বেশি। সব মিলিয়ে একজন বাণিজ্য বা মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের চেয়ে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা বাবদ খরচ হয় দেড় থেকে দ্বিগুণ বেশি। বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার অন্যতম কারণও এটি।

আরেকটি বড় কারণ চাকুরির বাজার। কিছুদিন আগেও ইঞ্জিনিয়ার কিংবা ডাক্তারদের যে চাহিদা বা মানমর্যাদা ছিল, সেটি এখন এমবিএ-র দখলে। অনেক ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার কিংবা বিজ্ঞানের অন্যান্য বিষয় থেকে পাশ করা তরুণরা বেকার বসে আছে। যারা বিজ্ঞান বিভাগের নানা বিষয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন করেছেন, তাদের অনেকেই বাড়তি একটি ডিগ্রি নিচ্ছেন চাকুরির আশায় এবং এই বাড়তি ডিগ্রিটি হচ্ছে এমবিএ। যে হারে বাজার কিংবা ব্যবসা বাড়ছে, সেই হারে এমবিএ গ্র্যাজুয়েট দেশে নেই; ফলে এই এমবিএ ডিগ্রিধারীদের একপ্রকার কদর এখন দেশে আছে। বাড়ছে সিএ কিংবা এ ধরনের ডিগ্রিধারীদের চাহিদা। অপরদিকে বিজ্ঞান থেকে পাশ করে অধিকাংশ শিক্ষার্থীকেই ব্যাংক-বীমা কিংবা বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত নয় এমন সেক্টরে কাজ করতে হচ্ছে। বাণিজ্য বিভাগ থেকে পাশ করা শিক্ষার্থীরা যেখানে সহজেই আর্থিক লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠান কিংবা কর্পোরেট হাউজগুলোতে কাজ পেয়ে যাচ্ছে, সেখানে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের চাকুরির জন্য বেশ কসরত করতে হচ্ছে। বলা যায়, বাণিজ্য বিভাগে রেজাল্ট ভালো হলে শিক্ষার্থীদের চাকুরি নিয়ে ভাবতে হয় না, যেটা বিজ্ঞান বিভাগের জন্য প্রযোজ্য নয়। এখন আর আগের মতো কেউ সন্তানদের মানুষ বানাতে বিদ্যালয় পাঠায় না, বরং বিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের চাকুরির জন্য যোগ্য করে তোলে। অভিভাবক যখন দেখবেন বিজ্ঞানে পড়লে চাকুরির সম্ভাবনা কম, বাণিজ্যে বেশি- তখন কেন সন্তানকে বাণিজ্য বিভাগ বাদ দিয়ে বিজ্ঞান বিভাগে পড়াবেন?

শিরোনাম অনুসারে লেখাটিতে শিক্ষার্থীরা বাণিজ্য বিভাগ বেছে নিচ্ছে কেন সেই বিষয়টির ওপর আলোকপাত করার কথা ছিল। কিন্তু হয়ে গেল উল্টোটা। শিক্ষার্থীরা কেন বিজ্ঞান বিভাগ ছেড়ে দিচ্ছে সেটিই মূলত আলোচিত হলো। আসলে বাণিজ্য বিভাগে এমন কোনো আকর্ষণ হঠাৎ করে তৈরি হয় নি যাতে শিক্ষার্থীরা দলে দলে আকৃষ্ট হয়ে যাবে। বিজ্ঞান বিভাগের ব্যর্থতার জন্যই শিক্ষার্থীরা বাণিজ্যে ঝুঁকছে এবং আলোচনাটি সে কারণেই বিজ্ঞান বিভাগের ব্যর্থতার ওপর আলোকপাত করেছে। সরকার এ নিয়ে কতোটুকু চিন্তিত জানি না, কিন্তু সরকারের উচিত হবে অবিলম্বে দেশে কী পরিমাণ বিজ্ঞান শিক্ষার্থী রয়েছে সেটি গবেষণা করে বের করে সে অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা। আর দক্ষ শিক্ষক এবং পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পুরনো এবং চিরন্তন কাজগুলো তো রয়েছেই।

লেখক: রিসার্চ কোঅর্ডিনেটর, প্ল্যান বাংলাদেশ, ঢাকা।

1 COMMENT

  1. বাকিসব মেনে নিলাম। ডাক্তাররা বেকার? বাঙালি সব সুস্থ হয়ে গেসে নাকি? এখনো হায় হুঁতাশ করি প্রাইভেটে মেডিকেল কেন পড়লাম না। লেখার সময় আর্টিকেল লেখক সজ্ঞানে ছিলেন তো ?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here