বাংলাদেশের শিক্ষা - ছোট
বাংলাদেশের শিক্ষা - ছোট


মুহম্মদ মাছুম বিল্লাহ: মানুষের পরিপূর্ণ বিকাশের ক্ষেত্রে স্বশাসন বা স্বনিয়ন্ত্রণ একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত । শিক্ষাক্ষেত্রেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। মানুষ জন্মগ্রহণ করে স্বাধীনতা ভোগ করার নিমিত্তে। শিশুকে খাওয়ানোর সময় সে হাত দিয়ে চামচ ধরতে চায় এবং নিজে খেতে চায়, হাঁটার জন্য নিজে পা বাড়ায়, বড় হলে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার জন্য কাজ খোঁজে। এগুলো সবই স্বাধীনতা লাভের জন্য প্রচেষ্টাসমূহ। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, এই জন্মগত স্বাধীনতার প্রবৃত্তি শিশু স্কুলে অনুসরণ করতে পারে না। শিশু শিক্ষার্থীরা সব সময়ই খুব বেশি উত্তেজিত থাকে এবং বিমোহিত হয় নতুন কিছু জানার জন্য এবং নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য। কিন্তু তাদের নিয়মানুবর্তী করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে তাদের সৃষ্টিশীল প্রতিভা বিকাশের পথে অন্তরায় হয়ে দাড়ায় স্কুলের শাসন এবং শিক্ষার্থী বঞ্চিত হয় তার স্বাধীনতা থেকে। এই স্বাধীনতা হরণ চলে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত। অথচ এই সময় একজন শিক্ষার্থীর শারীরিক ও মানসিকভাবে বেড়ে ওঠার প্রকৃত সময়।

প্রতিটি মুহূর্তেই আমরা জ্ঞান অর্জন করি বা করার বৃত্তের মধ্যে অবস্থান করি। ’ক্রিটিক্যাল পেডাগজি’ বলছে যে, শিক্ষক শিক্ষার্থীর কাছেও শেখে,শুধু শিক্ষার্থী শিক্ষকের কাছ থেকে শিখে না। ধরুন, উচ্চপদস্থ কোনো কর্মকর্তার ছেলে বা মেয়ে তার পরিবার এবং তার চারপাশ থেকে অনেক বিষয় শিখে যেগুলো একজন শিক্ষকের জানা নাও থাকতে পারে। আমার এক সহকর্মী বলেছিলেন, (উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তার মেয়েরা যখন কলেজে পড়ছে) ওদের কাছ থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। দেখলাম ব্যাপারটি আসলেই সত্য। অতএব, পেডাগজি শুধু শিক্ষক কিংবা শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক হবে না, হবে শিক্ষাকেন্দ্রিক। শিখন পরিবেশ সৃষ্টিশীল হয় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মত ও ভাব আদান-প্রদানের মাধ্যমে। এভাবে বলা যায়, কেহই পূর্ণ শিক্ষিত নয়। প্রত্যেকেই প্রত্যেকের ব্যক্তিগত চাহিদা অনুযায়ী পূর্ব অভিজ্ঞতা ও বিশ্বাস অনুযায়ী শিখতে পারে এবং জীবনের বাস্তবতার জন্য নতুন পথের সন্ধান পেতে পারে।

এভাবে শিক্ষার স্বাধীনতা ক্রিটিক্যাল পেডাগজির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীকে যদি জ্ঞানের উৎস ধরা হয়, তা হলে তাকে স্বাধীন হতে হবে এবং তখনই সে নিজের অভিজ্ঞাতাগুলোকে শ্রেণীকক্ষে নিয়ে যাবে। শিক্ষকের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে শিক্ষার্থীর শিক্ষার দায়িত্ব নিজেরা গ্রহণ করবে এবং জ্ঞানলাভের অন্যান্য উৎসের ওপরও নির্ভরশীল হবে। যেসব শিক্ষার্থীরা প্রকৃতিগতভাবেই মোটিভেটেড এবং মেধাবী তারাই ক্লাসের বাইরে অধিকাংশ কার্যাবলী গ্রহণ করতে রাজি হয, অন্যরা হয় না। তবে প্রকৃত মোটিভেটেড শিক্ষার্থীরা যারা শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে নিজেরা কাজ করবে তাদের সংখ্যা খুবই কম। অবশ্য এগুলো সবই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াও জগৎবিখ্যাত ব্যাক্তিবর্গ পৃথিবীতে আছেন, যারা প্রকৃতি এবং পারিপার্শ্বিক পরিবেশ থেকেই বেশি কিছু শিখেছেন, স্বশিক্ষিত হয়েছেন। অধিকাংশ শিক্ষার্থী যারা নিজেরা কিংবা স্বত:প্রণোদিত হয়ে কোনো কাজ করবে না তারা তাহলে কতটা স্বাধীনতা ভোগ করবে? নাকি তারা পুরোটাই শিক্ষকদের এবং প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে থাকবে? শিক্ষার সাথে জড়িত সবাইকে বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে।

বিভিন্ন উদ্দেশে পড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা সাধারণভাবে জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাফল্যের জন্য অত্যাবশ্যক। শিক্ষার্থীর সামাজিক এবং আবেগীয় উন্নয়নের জন্য পড়ার ভূমিকা অনেক। শিক্ষার্থীরা যদি বিভিন্ন ধরনের পড়ার বিষয় বা ম্যাটেরিয়ালস না পড়ে তাহলে তারা অনেক গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক স্কিল হারাবে। পড়ার মাধ্যমে তারা তাদের আত্মবিশ্বাস জাগ্রত করবে। পড়া বিভিন্ন বিষয় যেমন গণিত, ইতিহাস, বিজ্ঞান, সাহিত্য এবং ভুগোল সম্পর্কে জানার দ্বার উন্মোচন করে। এভাবে পড়ুয়ারা এসব বিষয়ে সহজেই সাফল্য অর্জন করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, ছোট সময় থেকেই পড়ার অভ্যাস মানুষকে অনেক বেশি পজিটিভ বিষয় দান করে, তাই ছোট সময় থেকেই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে আর এ বিষয়টি খেয়াল রাখবেন অভিভাবক ও শিক্ষকগণ। আর এই পড়া মানে শিক্ষার্থী তার স্বাধীনতা ব্যবহার করবে জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে ।

একজন শিক্ষক যত ভালোই হোক, শিক্ষার্থীরা কখনই ভাষা শিখবে না বা অন্য কোন বিষয় শিখবে না যদি না তিনি শিক্ষার্থীদের ক্লাসে এবং ক্লাসের বাইরে শেখার সুযোগ এবং ক্ষেত্র তৈরি করে না দিতে পারেন। এর কারণ হচ্ছে, ভাষা শেখা একটি জটিল কাজ এবং বিভিন্নমাত্রিক এজন্য শিক্ষার্থীদের বেশ সময় ব্যয় করতে হয়। ডেভিড নুন্যান বলেছেন, ”ক্লাসে সবকিছু শেখানো যায় না।” যদি যায়ও তারপরেও বিষয়টি খেয়াল রাখা দরকার যে, একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীর পাশে সবসময় থাকেনা যখন শিক্ষার্থী বাস্তব জীবনে ভাষা ব্যবহার করে।

ক্লাসের কম সময় পুষিয়ে নেওয়ার জন্য, নিস্ক্রিয়তা দূর করার জন্য এবং শিক্ষার্থীর নিজের ভাষা উন্নয়নের জন্য শিক্ষার্থীদের যতটা সম্ভব স্বাধীন শিক্ষার্থী হতে হবে। তবে সবসময় একাকী বা নিজ থেকে এ ব্যাপারটি হয়ে ওঠে না। শিক্ষা- সংস্কৃতির দ্বারা এটি নিয়ন্ত্রিত হয় যে, সংস্কৃতিতে শিক্ষার্থী ভাষা শেখে এবং বেড়ে ওঠে।

একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের ক্লাসে স্বাধীনতা দিতে পারেন রিফ্লেকশন বা প্রতিফলনের মাধ্যম। শিক্ষার্থীরা কী শিখেছে তার প্রতিফলন ঘটানোর জন্য শিক্ষক বিভিন্ন ধরনের অ্যাক্টিভিটি করাতে পারেন ক্লাসে যেখানে শিক্ষার্থীরা নিজের স্বাধীনতা প্রয়োগ করতে পারে। রিফ্লেকশন শিক্ষার্থীর ভালো ও দুর্বল দিকগুলো নিয়ে চিন্তা করতে সহায়তা করে। ভাষা শেখার ক্ষেত্রে স্পিকিং কঠিন কেন? শিক্ষার্থীরা যখন কম স্বাধীনতা ভোগ করে তাদের স্পিকিং স্কিল তখন ধীর গতিতে অগ্রসর হয় ।

এক সপ্তাহ কিংবা দুই সপ্তাহ পরে বিশেষ কোনো লেসনের ওপর শিক্ষার্থীদের মতামত নেয়া যেতে পারে যেখানে শিক্ষার্থীরা স্বাধীনতা প্রয়োগ করতে পারে। ক্লাসের বাইরে বাসার কাজই শিক্ষার্থীর স্বাধীনতা প্রয়োগ করার শক্তিশালী পথ। এখানে শিক্ষকের সাহায্য ছাড়া শিক্ষার্থী কাজ করে। তবে শিক্ষককে নির্দিষ্ট করে দিতে হয়। কতটুকু হোমওয়ার্ক শিক্ষার্থী বাসায় করবে- স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এতটুকুই একজনের শিক্ষকের করা উচিত। শিক্ষককে খেয়াল রাখতে হবে একজন শিক্ষার্থীকে শুধু একটি বিষয় অধ্যয়ন করতে হয় না, একাধিক বিষয় পড়তে হয়। হোমওয়ার্ক শিক্ষার্থীর স্বাধীনতা প্রয়োগ করতে গিয়ে যেন বোঝা না হয়, তাহলে তারা ক্লাসে আসার আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে এবং হোমওয়ার্ক না আনার জন্য শাস্তি ভোগ করবে কিংবা তিরস্কৃত হবে। ফলে শিখতে গিয়ে যতটুকু স্বাধীনতা ভোগ করেছে তার চেয়ে বেশি শাসিত ও নিয়ন্ত্রিত হবে। তখন বাড়ির কাজকে ’লার্নার অটোনমির’ চেয়ে বোঝা এবং ঝামেলা হিসেবে দেখবে তারা। হোমওয়ার্ক প্রাসঙ্গিক হতে হবে তা না হলে আনন্দ পাবে না।

অনেক শিক্ষক শিক্ষার্থীদের ডায়েরি বা জার্নাল লিখতে বলেন যাতে শিক্ষার্থীরা রিফ্লেক্ট করতে পারে তাদের সাফল্য, কঠিনত্ব। এখানে শিক্ষার্থী যা শিখেছে সে সম্পর্কে লিখতে পারে আবার সম্পূর্ণ নতুন বিষয়ও লিখতে পারে। গ্রুপ/জুটিতে কাজও শিক্ষার্থীর স্বাধীনতা প্রয়োগ করার ক্ষেত্র তৈরি করে। এসব বিষয় এবং টেকনিক একজন শিক্ষককে জানতে হবে তার শিক্ষার্থীদের স্বাধীনতা দেওয়ার জন্য। একজন শিক্ষার্থী যদি দেখে বা বুঝে যে, তাকে যে কাজটি দেয়া হয়েছে সেটি তার জন্য খুবই সহজ কিংবা তার সীমার একেবারেই বাইরে অর্থাৎ বেশ কঠিন তবে সে ব্যাপারটি তাকে সবচেয়ে বেশি ডিমোটিভেটেড করবে।

আমাদের দেশে শিক্ষার্থীদের স্বাধীনতা ব্যাপারটি একেবারেই অপরিচিত। প্রতিষ্ঠান প্রধান বা শ্রেণীশিক্ষক যত বেশী কঠোর হতে পারেন, শিক্ষার্থীদের যত চাপে রাখতে পারেন অভিভাবকগন ও সমাজ সেই সব শিক্ষকদের বেশ মূল্যায়ণ করেন, তাদেরকে বাহবা দেন। শিক্ষার্থীর স্বাধীনতা না থাকলে শিক্ষা পূর্ণাঙ্গ রূপ পায় না।

ক্যাডেট কলেজে কড়া শাসনের মধ্যে শিক্ষার্থীরা বেড়ে ওঠে কারণ ওখানে বিশেষ এক ধরনের শিক্ষা প্রদান করা হয়, তাই ওই ধরনের পরিবেশ তাদের উপযোগী এই যুক্তি প্রয়োগ করা হয়। একবার একজন সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র প্রশ্ন করে বসল, স্যার ক্লাসে আমরা কথা বলতে পারি না, ডাইনিং হলেও মিনিটে মিনিটে ’নো টক’, মসজিদে তো নয়ই, হাউসের রুমে সিনিয়র ক্যাডেট থাকে বিধায় কথা বলতে পারি না, আমরা আসলে কথা বলবটা কোথায়? ছোট ছেলের স্বাধীনতা প্রাপ্তির জন্য ভাইস-প্রিন্সিপালের রুমে যাওয়া। এটি মানব স্বাধীনতা পিপাসার উদাহরণ। ডিসিপ্লিন রক্ষার নামে আমরা যা করি তা শিক্ষার্থীর মানসিক দিক কতটা বাধাগ্রস্ত করে তা আমরা কখনও চিন্তা করে দেখেছি?

আমাদের দেশে এখন অনেক ভালো ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান সেনাবাহিনী থেকে আনা হয় কারণ সমাজব্যাপী এই বিশ্বাস যে, যে প্রতিষ্ঠান প্রধান যত বেশি কঠিন ঐ প্রতিষ্ঠান বা প্রতিষ্ঠানপ্রধান তত ভালো ও সফল। ব্যাপারটি কি আসলেই তাই? ঐসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা স্বাধীনতা একেবারেই ভোগ করতে পারে না। না পারে ক্লাসে, না ক্যাম্পাসে, না কোনো অনুষ্ঠানে, সর্বত্রই কঠোরতার ছাপ আর এই ছাপই ঐসব প্রতিষ্ঠানকে বিখ্যাত করেছে, অর্থাৎ পুরো সমাজে এক ধরনের আইডিয়া হয়েছে যে, এগুলোই ভালো প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়ে আসা ছাত্র-ছাত্রীরা একাডেমিক ফল হয়ত ভালো করে কিন্তু ক্রিয়েটিভ হয় না, অর্জন করতে পারে না নেতৃত্বের গুণাবলী। নেতৃত্বের গুণাবলী অর্জন করতে হলে শিক্ষার্থীদের স্বাধীনতা ভোগ করতে দিতে হবে তাতে আপাত কিছু সমস্যা হবে কিন্তু তার মধ্যেই অর্জিত হবে প্রকৃত শিক্ষা। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সামরিক শাসন যেমন কোনো পথ নয়, গণতান্ত্রিক সরকার যত ঝামেলাপূর্নই হোক না কেন তার মধ্যেই গড়ে ঊঠে সত্যিকার শাসন ব্যবস্থা। একইভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে ভবিষ্যত প্রজন্মকে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলার নিমিত্তে ।

লেখক: প্রোগ্রাম ম্যানেজার, ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচি, ঢাকা। সাবেক ফ্যাকাল্টি, ঘাটাইল ক্যান্টনমেন্ট কলেজ, সিলেট ক্যাডেট কলেজ, কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজ, মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ, রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here