বাংলাদেশের শিক্ষা - ছোট
বাংলাদেশের শিক্ষা - ছোট


নাঈমুল হক: আমার এক শ্রদ্ধেয় শিক্ষক প্রায়ই বলতেন, “শিক্ষার্থীরা যতোটা শিক্ষার্থী, তার চেয়ে বেশি পরিক্ষার্থী”। তাই পরীক্ষার তালিকাও দিনে দিনে বেড়েছে। বিদ্যালয় ভর্তিপরীক্ষা, অজস্র শ্রেণী পরীক্ষা, প্রতিবছর একাধিক সাময়িক পরীক্ষা, বার্ষিক পরীক্ষা, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা, জুনিয়র সার্টিফিকেট পরীক্ষা, বৃত্তি পরীক্ষা, এসএসসি পরীক্ষা, এইচএসসি পরীক্ষা, উচ্চশিক্ষার সুযোগলাভে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক নির্বাচনী পরীক্ষা ইত্যাদি। এখানেই থামছি কেনোনা সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষার্থীদের এর পরের পরীক্ষাগুলোতে তো বটেই, অনেকের এপর্যন্তও অংশগ্রহণ করতে হয় না! যাদের এই সৌভাগ্য জোটে তাদের ভোগান্তিও কম নয়। কেন এত পরীক্ষা? এসব পরীক্ষা কতোটাই বা কার্যকরী?

এসএসসির ফল দিয়ে খাওয়া যায় এইচএসসি পড়াকালীন দুই বছর। এইচএসসিএর ফল দিয়ে খাওয়া যায় উচ্চশিক্ষা অর্জনের পূর্বের ছয় মাস! আর উচ্চশিক্ষার সুযোগলাভে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক নির্বাচনী পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে শুধু নিজের সারাজীবনই নয়, ভবিষ্যত বংশধররাও খেতে পারে। সম্প্রতি মাধ্যমিক ও উচ্চ-মাধ্যমিকের ফলাফলের ভিত্তিতে মেডিকেল ভর্তির জন্যে সিদ্ধান্তটি নিয়ে আলোচনার ঝড় উঠেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর চাইছে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের ফলাফলের মাধ্যমেই কতকের জীবনভর খাওয়া-পরার সেই সুযোগ করে দিতে। যা আমাদের শিক্ষার্থীর অর্জন ও মূল্যায়ন সংক্রান্ত বেশ কিছু পুরোনো বিতর্ককেও পুনরুজ্জীবিত করে তুলেছিল। বর্তমানে এক বছরের জন্যে অ্যানেসথেসিয়া দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখলেও সেই বিতর্ক আবার যেকোনো সময় জেগে উঠতে পারে।

চকচক করলেই সোনা হয় না, তাই বোধহয় কষ্টিপাথর দ্বারা সোনা কতোটা খাঁটি, তার পরীক্ষা করা হতো। কষ্টিপাথর খাঁটি হলে একাধিক কষ্টিপাথরে একই ফল পাবার কথা; কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার একেক কষ্টিপাথরে একেক ফল পাওয়া যাচ্ছে। এসএসসি ও এইচএসসি নামক কষ্টিপাথরে যারা ‘সোনালী পাঁচ’ পাচ্ছে, উচ্চশিক্ষার সুযোগলাভে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক নির্বাচনী পরীক্ষায় তাদের অনেকে কাচকলাও দেখছে! ভেজালের এই কালে তাই বোঝা মুশকিল কোনটা আসল কষ্টিপাথর, আর কোনটাই বা আসল সোনা।

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের ফলাফলের ভিত্তিতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিদ্ধান্তটি নিঃসন্দেহে অদূর ভবিষ্যতে বাস্তবায়নের বিবেচনার দাবি রাখে। তবে তার আগে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের মূল্যায়নকে নির্ভরযোগ্য করে তুলতে হবে। উত্তরপত্র মূল্যায়নে শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় সময় ও যথাযথ সম্মানী দিতে হবে। বোর্ডভিত্তিক পৃথক প্রশ্নপত্র শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নে তাৎপর্যপূর্ণ কোনো পার্থক্য রাখে কিনা তাও বিবেচনা করতে হবে।

এতোসব পরীক্ষা আমাদের শিক্ষাকে আনুষ্ঠানিকতাসর্বস্ব করে তুলছে। আমাদের এই ধারা থেকে অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে। ধারণা করা হয়, শরীরে কোনো রোগের বাস যতদিন তার কমপক্ষে এক-তৃতীয়াংশ সময় রোগের আরোগ্য লাভের জন্যে আবশ্যক। তাই ক্রমে ক্রমে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষাসমূহকে ছেটে ফেলতে হবে।

প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পৃথক নির্বাচনী পরীক্ষা নেবার অধিকার রয়েছে। ঐক্যমতের ভিত্তিতে একীভূত পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব না হলে ভর্তি পরীক্ষার নামে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি দমন করা কঠিন। সারাজীবন পরীক্ষার ঝোলানো মুলার পেছনে ছোটা বন্ধ করতে তাই শোনা যাচ্ছে নিত্যনতুন ফর্মুলা। এক্ষেত্রে আমি তিনটি ফর্মুলা উপস্থাপন করছি।

ফর্মুলা নং ১: ভর্তি পরীক্ষা হ্রাসকরণ (৫০ পরীক্ষা থেকে ৮টি পরীক্ষা )
উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পর শিক্ষার্থীরা স্বল্প সময়ের মাঝে শিক্ষার্থীরা নিচের তালিকা থেকে পছন্দ অনুসারে পরীক্ষায় অংশ নেবে।
– এমবিবিএস ভর্তির জন্যে ১টি পৃথক পরীক্ষা
– ইনজিনিয়ারিং ও ভৌত বিজ্ঞান ভর্তির জন্যে ১টি পৃথক পরীক্ষা
– জীববিজ্ঞান,পরিবেশ বিজ্ঞান ও কৃষিবিজ্ঞানে ভর্তির জন্যে ১টি পৃথক পরীক্ষা
– কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান ভর্তির জন্যে ১টি পৃথক পরীক্ষা
– বাণিজ্য বিভাগে ভর্তির জন্যে ১টি পরীক্ষা
– বিভাগ পরিবর্তনে আগ্রহীদের জন্যে বিভাগভিত্তিক পৃথক ৩টি পরীক্ষা

ফর্মুলা নং ২: ভর্তি পরীক্ষা হ্রাসকরণ
উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পর শিক্ষার্থীরা স্বল্পসময়ের মাঝে একটি মাত্র পরীক্ষায় অংশ নেবে। যাতে থাকবে (বাংলা, ইংরেজি, পদার্থবিজ্ঞান, গণিত, রসায়ন, জীববিজ্ঞান, সাধারণ জ্ঞান, হিসাববিজ্ঞান, ব্যবসায়নীতি ও বুদ্ধিমত্তার সমন্বয়ে) সর্বজ্ঞান যাচাইয়ে সহায়ক ক্লাস্টার প্রশ্নমালা।

বিজ্ঞান বিভাগের কোনো শিক্ষার্থী এখান থেকে যদি বাংলা, ইংরেজি, পদার্থবিজ্ঞান, গণিত, রসায়ন, জীববিজ্ঞান, সাধারণ জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার প্রশ্নগুলোর উত্তর করে তবে-
– পদার্থবিজ্ঞান, গণিত, রসায়ন, জীববিজ্ঞান, ইংরেজি ও বুদ্ধিমত্তার প্রাপ্ত মান দ্বারা তার ইনজিনিয়ারিং ও ভৌত বিজ্ঞানে ভতি যোগ্যতা দেখা যেতে পারে।
– জীববিজ্ঞান, রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান, ইংরেজি ও বুদ্ধিমত্তার প্রাপ্ত মান দ্বারা এমবিবিএস ভর্তির যোগ্যতা দেখা যেতে পারে।
– ইংরেজি, পদার্থবিজ্ঞান, গণিত, রসায়ন, জীববিজ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার প্রাপ্ত মান দ্বারা জীববিজ্ঞান, পরিবেশ বিজ্ঞান ও কৃষিবিজ্ঞানে ভর্তির যোগ্যতা দেখা যেতে পারে।
– বাংলা, ইংরেজি, সাধারণ জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার প্রাপ্ত মান দ্বারা বিভাগ পরিবর্তন করার যোগ্যতা দেখা যেতে পারে।
একইভাবে যৌক্তিকভাবে সঙ্গত বিষয় সমষ্টির প্রাপ্ত মানের সমন্বয়ে মানবিক ও বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষার্থীদেরও উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা যেতে পারে।

উপরের দুটো ফর্মুলা পরীক্ষা কমাতে পারলেও ব্যাঙের ছাতার মত গড়ে ওঠা বিশ্ববিদ্যালয় কোচিং সেন্টারের কিছু করতে পারবে না। সেক্ষেত্রে নিচের ফর্মুলাটি অনুসরণ করা যেতে পারে।

ফর্মুলা নং ৩: ভর্তি পরীক্ষা নির্মুলকরণ (উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় নৈর্ব্যত্তিক প্রশ্নমালা সংযোজন )
প্রচলিত ব্যাবস্থায় মাধ্যমিক, বিশ্বদ্যিালয়ে ভর্তি পরীক্ষা বা চাকুরিলাভের পরীক্ষাতেও নৈর্ব্যত্তিক পরীক্ষা দিতে হয়। কেবল উচ্চমামাধ্যমকেই ছন্দপতন। তাই এই ফর্মুলায় সুপারিশ করা হল, উচ্চমাধ্যমিকে ভুল উত্তরের জন্যে ঋণাত্তক মানসহ নৈর্ব্যত্তিক পরীক্ষার সংযোজন। এতে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার মূল্যায়নে কিছুটা হলেও নির্ভরযোগ্যতা আসতে পারে।

বলা হয়,যত পথ তত মত। এমন হাজার পথে কঠিন সমস্যার পরিকল্পিতভাবে সহজ সমাধান হতে পারে। প্রয়োজন সবার মত যাচাই ও পরিশেষে নির্ধরিত সময়ের পর থেকে দীর্ঘমেয়াদী সময়কালে গৃহীত পদ্ধতি প্রয়োগের ঐক্যমত।

নাঈমুল হক: শিক্ষার্থী, প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here