বাংলাদেশের শিক্ষা - ছোট
বাংলাদেশের শিক্ষা - ছোট


সহসম্পাদক: প্রিয় লেখক ও পাঠক, আমরা আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, ২০১৪ সালের জানুয়ারি – মার্চ পর্যন্ত যেসব লেখা ‘বাংলাদেশের শিক্ষা’ ওয়েব সাইটে প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে “শিক্ষার্থীদেরকে দিয়ে ক্লাস নেওয়ানো: একটি প্রস্তাবনা”  লেখাটি সেরা লেখা হিসেবে বিচারক নির্বাচন করেছেন। লেখক শেখ শাহবাজ রিয়াদ, সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, ঢাকা-এর সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। আর এই প্রান্তিকের বিচারক হিসেবে আমাদের সাথে ছিলেন ইউনিসেফের শিক্ষা কর্মকর্তা লায়লা ফারহানা আপনান বানু। লেখাটি মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি বলেছেন:

শিক্ষার্থীদেরকে দিয়ে ক্লাস নেওয়ানো: একটি প্রস্তাবনা” শীর্ষক লেখাটি আমার বিবেচনায় ২০১৪ জানুয়ারি – মার্চ প্রান্তিকে ‘বাংলাদেশের শিক্ষা’য় প্রকাশিত সর্বশ্রেষ্ঠ লেখা। লেখাটির আঙ্গিকগত বৈশিষ্ট্যের চেয়ে এটির অন্তর্নিহিত উদ্ভাবনী ভাবনাটি আমার কাছে সবিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়েছে। এটি একান্তই আমার ব্যক্তিগত মতামত, অন্য যে কারোরই এতে ভিন্নমত পোষণের অবকাশ রয়েছে।

লেখাটি মূলত বহুলপ্রচলিত শিক্ষককেন্দ্রিক শিক্ষাদান পদ্ধতির তাত্ত্বিক বা দার্শনিক ভিত্তি পর্যালোচনার পাশাপাশি এর প্রায়োগিক দিকের দূর্বলতা গুলো চিহ্নিত করেছে। ভাববাদী দর্শন প্রভাবিত শিক্ষাচর্চা থেকে কিভাবে ঐতিহাসিকভাবে প্রয়োগবাদী দর্শন প্রভাবিত শিক্ষাচর্চার উদ্ভব ঘটেছে তাতে আলোকপাত করার পাশাপাশি এই লেখায় ভারতীয় উপমহাদেশে শেষোক্ত শিক্ষা দর্শনের বিস্তারের দিকটিও তুলে ধরা হয়েছে।

তবে ঐতিহাসিক বা দার্শনিক ভিত্তির চেয়েও আমার মনে হয় লেখাটির আবেদন এর প্রায়োগিক সম্ভাবনায়। কেননা এটি বাংলাদেশের সুবিশাল শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় সমস্যা ‘শিক্ষক স্বল্পতা’র বিষয়টি বিবেচনায় এনে একটি সম্ভাব্য কার্যকর সমাধান এখানে পেশ করার চেষ্টা করেছে। সমাধানটি আপাতদৃষ্টিতে সম্ভাবনাময়, এই কারণে যে এর প্রয়োগে অনেক অর্থ বা সম্পদ যোগানের প্রয়োজন নেই। আমাদের মত স্বল্প সম্পদের দেশে শিক্ষক স্বল্পতা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী উচ্চহার, যা শিক্ষার গুণগত মানকে ক্রমাগত প্রভাবিত করে চলেছে, তার একটি গ্রহণযোগ্য সহজ সমাধান লেখক প্রস্তাব করেছেন। এই প্রস্তাবনার মাধ্যমে শিক্ষক স্বল্পতা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী উচ্চহার কমানোর মত সময়োপযোগী কিন্তু সহজ সমাধান যেমন খুঁজে পাওয়া যায়, তেমনি এই প্রস্তাবনার আরও কিছু প্রচ্ছন্ন ইতিবাচক প্রভাবও আমি দেখতে পাই। যেমন:

প্রথমত, সমগ্র পৃথিবী এখন শিক্ষার ব্যাংকিং মডেল বা জগ-মগ তত্ত্বকে অস্বীকার করে এবং শিক্ষা পরিকল্পনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে শিক্ষার্থীকে নিয়ে আসার কথা বলে। এই পরিবর্তিত তাত্ত্বিক দিকের মূল কথা হলো শিক্ষার্থী তার শিখন প্রক্রিয়ায় কোনভাবেই নিষ্ক্রিয় নয়, বরং তাকে শিখতে হলে তাকে অবশ্যই সক্রিয় হতে হবে। বস্তুত সক্রিয় মনই কেবল শিখতে পারে। আর যদি শিখন-শেখানোর এমন কোন পদ্ধতি প্রবর্তন করা যায় যেখানে শিক্ষার্থীরাই অন্য শিক্ষার্থীদের শিখন কাজে সহযোগিতা দেবে, তবে সেখানে কিন্তু শিক্ষার্থীদের সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের সুযোগটি তৈরি করে দেয়া হচ্ছে। সে বিবেচনায় যারা শিখন কাজ পরিচালনার কাজটি করবে, তারা একটি উদ্দেশ্যমুখী (purposeful) পরিবেশে অন্যের শিখনকাজে সহায়তা দানের পাশাপাশি নিজের শিখন অভিজ্ঞতাকেও সমৃদ্ধ করবার দারুণ সুযোগ পাবে।

দ্বিতীয়ত, আমাদের যুবসমাজ পুস্তকনির্ভর পুঁথিগত বিদ্যা আয়ত্ত করলেও কর্মমুখী শিক্ষার সুযোগ পায় খুবই কম। এছাড়া সমাজ পরিবর্তনের কোন ইতিবাচক পদক্ষেপে তাদের কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত হবার সুযোগটিও তেমন নেই বললেই চলে। অথচ যুবসমাজই একটি জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে আবেগী, সবচেয়ে স্বপ্নবান, সবচেয়ে ভাবালু অংশ যারা সবধরনের সনাতন প্রথা ভেঙ্গে নতুন কিছু করবার অন্তর্গত তাগিদ অনুভব করে। যদি যুবসমাজের এই আবেগিক চাপকে একটি ইতিবাচক দিকে চ্যানেল করে সমাজ গড়ার কাজে সম্পৃক্ত করা যায়, তবে দু’দিক থেকেই উপকৃত হবার সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যায়। যেমনি এই যুবসমাজের মানসগঠন শিক্ষকতার মত একটি সৃষ্টিশীল কাজে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে সমৃদ্ধ করা যায়, যেমনি তাদের হতাশা ও মূল্যবোধের অবক্ষয় থেকে রক্ষা করা যায়, তেমনি একটি জরাজীর্ণ ধুঁকতে থাকা শিক্ষাব্যবস্থা হঠাৎ করে কিছু প্রলম্বিত সমস্যার আশু সমাধান খুঁজে পেতে পারে। আমার মনে হয় লেখাটির অনন্যতা এখানেই, এই অসীম সম্ভাবনাময় প্রস্তাবনাটিকে তুলে ধরায়, যার মাধ্যমে আমাদের সমস্যাসংকুল শিক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদী মানবসম্পদ সংকটকে একটি সহজ কিন্তু কার্যকর সমাধান দেয়া যেতে পারে। সন্দেহ নাই যে এই ধারণার বাস্তবায়নের জন্য একটি চৌকষ গতিশীল নেতৃত্বের প্রয়োজন হবে, যারা তরুণদের শক্তিতে আস্থা রাখেন; তবে শিক্ষার সাপ্লাই এবং ডিমান্ডের একটি কার্যকর ইন্টারফেস হিসেবে আমি প্রস্তাবনাটির একটি অসীম সম্ভাবনা দেখতে পাই।

লেখাটিতে এই ধারণা বাস্তবায়নের সময় লক্ষণীয় দিকসমূহের উপরেও আলোকপাত করা হয়েছে। এর প্রায়োগিক সম্ভাবনার বেশ কিছু ক্ষেত্রও উদাহরণ হিসেবে এসেছে। আমার মনে হয় পিয়ার-টু-পিয়ার লার্ণিং অ্যাপ্রোচের পূর্ণ বাস্তবায়ন আমাদের দেশের সমাজ-বাস্তবতায় এখনও একটি রোমান্টিক ধারণা হিসেবেই রয়ে গেছে; কিন্তু এখন সময় এসেছে আসলেই এই বিষয়ে গুরুত্বের সাথে কিছু করার। আমি সেই সহজ কিন্তু কার্যকর সমাধান এই প্রস্তাবনায় দেখতে পাচ্ছি যার রিপল ইফেক্ট হতে পারে বহু বহু গুণ, যদি সঠিকভাবে এই ধারণার বাস্তবায়ন ঘটানো যায়। আমি লেখককে তার এই মৌলিক চিন্তার জন্য সাধুবাদ জানাই। অন্য যাঁরা এ প্রান্তিকে লিখেছেন সাধুবাদ তাদেরও প্রাপ্য, তাদের ক্রমপ্রচেষ্টায় একটি সুশিক্ষিত শিক্ষা-পেশাজীবী কমিউনিটি বাংলাদেশে গড়ে উঠবে এই আশাবাদ ব্যক্ত করি। আমাদের সবার একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা নিশ্চয়ই একটি চমৎকার শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করতে পারবো, যার মূল কেন্দ্রে থাকবে শিক্ষার্থী – তাদের সক্রিয়তা, সৃষ্টিশীলত, সৃজনশীলতা এবং সকল সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ। সকলকে ধন্যবাদ।

বিচারক লায়লা ফারহানা আপনান বানুর নির্বাচন আনুসারে জানুয়ারি-মার্চ ২০১৪ প্রান্তিকের সেরা লেখার জন্য পুরুষ্কার পেতে যাচ্ছেন শেখ শাহবাজ রিয়াদ। লেখককে অভিনন্দন! আমরা আশা করবো, ভবিষ্যতে তাঁর শক্তিশালী লেখনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রের নীতিগত ও প্রায়োগিক বিষয়গুলো তুলে ধরবেন। শিগগিরই লেখকের ঠিকানায় পৌঁছে যাবে শুদ্ধস্বর থেকে প্রকাশিত ও আমাদের নির্বাচিত ৫০০ টাকা সমমানের অমূল্য উপহার- বই।

index

আর একই সাথে ধন্যবাদ জানাচ্ছি বিচারক লায়লা আপনান বানুকে। তিনি তাঁর মূল্যবান সময় দিয়ে এই প্রান্তিকের সবগুলো লেখা পড়েছেন এবং সেরা লেখা নির্বাচনের পেছনে তাঁর মতামতগুলো যুক্তিকারে সুন্দরভাবে আমাদের সামনে তুলে ধরছেন। শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার কিভাবে আমাদেরকে একটি সুশিক্ষিত পেশাজীবী কমিউনিটি গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে আমরা তাঁর বিশ্লেষণে তা খুঁজে পাই। বিচারকের প্রতি রইলো আমাদের আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।


ঘোষণা

চলতি প্রান্তিক অর্থাৎ ২০১৪ সালের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকের জন্যও বিচারকের দায়িত্ব পালন করবেন এই পর্বের বিচারক লায়লা ফারহানা আপনান বানু। এই দায়িত্বটি পালন করতে সম্মত হওয়ায় তাঁকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

আমাদের এই উদ্যোগ বা পুরষ্কার সম্পর্কে আপনাদের কোনো প্রশ্ন, মতামত বা পরামর্শ থাকলে এখানে জানাতে পারেন। আশা করছি, এই উদ্যোগে আপনাদেরকে আমরা সাথে পাবো। ধন্যবাদ।

Previous articleশিক্ষাক্ষেত্রে ডিজিটালাইজেশন: সংশ্লিষ্টদের বিড়ম্বনা
পরবর্তী লেখাগণিত ফোরাম খুলনা: সম্ভাবনা ও প্রতিবন্ধকতা
আকলিমা শরমিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে বিএড (অনার্স) ও এমএড ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে। পেশাগত জীবন শুরু করেন ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে। এরপর কাজ করেছেন অঙ্কুর আইসিটি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন, ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ এবং ব্রিটিশ কাউন্সিলে। বর্তমানে ম্যানেজার-আইসিটি ইন এডুকেশন হিসেবে কর্মরত রয়েছেন আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেনে। সরাসরি শিক্ষকদের সঙ্গেও যেমন কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে, তেমনি কাজ করেছেন শিক্ষার্থীদের নিয়েও। ইচ্ছা শিক্ষা নিয়েই কাজ করার। শিক্ষাকে একটি স্বতন্ত্র বিজ্ঞান বা discipline হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য কাজ করে যেতে চান সবসময়। পেশাগত কাজের পাশাপাশি আকলিমা শরমিন 'বাংলাদেশের শিক্ষা' ওয়েবসাইটের সহযোগী সম্পাদক হিসেবেও কর্মরত রয়েছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here