শাস্তি

আকতার বানু


বাংলাদেশে প্রায় সব পেশাতে যোগ দেওয়ার আগে ওই পেশার কাজ সম্পর্কে কিছুটা প্রশিক্ষণ নেওয়ার বিধান আছে। শিক্ষকতা পেশায় তা নিতে হয় না। বিদ্যালয়, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় কোথাও যোগদানের পর ক্লাসে যাবার আগে কীভাবে পড়াতে হয়, সে সম্পর্কে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেয়ার রীতি কম। ফলে শিক্ষকরা নিজস্ব অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে যে যার মতো পাঠদান করেন। কিন্তু ভালো শিক্ষার্থী হওয়ার চেয়ে ভালো শিক্ষক হওয়া অনেক বেশি কঠিন। শিক্ষার গুণগত মান কমে যাবার পিছনে এটিও একটি বড় কারণ।

আমাদের বেশিরভাগ শিক্ষক জানেন না, কী করে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ বাড়ানো যায়, কীভাবে শিক্ষার্থীদের মনে প্রেষণা সৃষ্টি করতে হয়, শিখন ( learning) কীভাবে ঘটে, শিখনের উপাদান কী কী, শিক্ষণের (teaching) কার্যকর ও আধুনিক পদ্ধতিগুলো কী কী, শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শিক্ষণ-শিখন পদ্ধতি কী ও কেন, কীভাবে শেখালে শেখা সহজ হয়, দীর্ঘস্থায়ী হয়, পরীক্ষা বা মূল্যায়ন পদ্ধতি কেমন হওয়া উচিত, শিক্ষার্থীদের অসঙ্গতিমূলক আচরণের কারণ ও প্রতিকার, একজন সার্থক শিক্ষকের বৈশিষ্ট্য কী হওয়া উচিত, শিক্ষকের আত্মোপলব্ধি ও আত্মমূল্যায়ন কী ও কেন, কর্মসহায়ক গবেষণা কী ও কেন, বিদ্যালয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার কৌশলগুলো কী কী, মানুষের ভালো-মন্দ আচরণের কারণ ও তাতে শিক্ষার ভূমিকা কী, শিক্ষার্থীর ভালো-মন্দ আচরণে পরিবার-সমাজ-বিদ্যালয়-শিক্ষক-সহপাঠী-প্রতিবেশী-সমাজ-ধর্ম-অর্থনীতি-রাজনীতি-দর্শন ইত্যাদির প্রভাব কতটা, শিক্ষার্থীর শিখনে প্রেষণা, আবেগ, পুরস্কার, শাস্তি, প্রবণতা, ক্ষমতা, বুদ্ধি, ইত্যাদির প্রভাব কেমন ইত্যাদি। শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ না থাকার কারণে শাস্তিকেই বেশিরভাগ শিক্ষক শেখানোর বা শ্রেণি নিয়ন্ত্রণের একমাত্র হাতিয়ার বলে মনে করেন।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে শেখার জন্য প্রেষণা সৃষ্টি করা যায়। উপদেশনা, নির্দেশনা দিয়ে শিক্ষার্থীর ত্রুটিপূর্ণ আচরণ সংশোধন করা যায়, কোনো শিক্ষার্থী পড়া না পারলে বা কম পারলে বিশেষ যত্ন নিয়ে শেখানো যায়। শিক্ষাদানের দক্ষতা দিয়ে বা শিক্ষকের আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব দিয়ে শ্রেণি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। গবেষণা করে মনোবিজ্ঞানীরা শ্রেণিকক্ষ নিয়ন্ত্রণে মনোবিজ্ঞানসম্মত কিছু শাস্তি ও পুরস্কারের কথা বলেছেন যা বেশিরভাগ শিক্ষক না জানার কারণে প্রয়োগ করেন না।

বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার জন্য ক্ষতিকর আচরণ পরিহার ও ভালো কাজ বা সফলতার স্বীকৃতি, জ্ঞানার্জনের প্রেষণা বা উৎসাহ প্রদান বা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভালো ফলাফল করার জন্য প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব সৃষ্টির উদ্দেশ্যে মনোবিজ্ঞানীরা দুই ধরনের পুরস্কারের ব্যবস্থা করতে বলেন। যেমন—

১. বস্তুগত পুরস্কার (যেমন, বই, খেলনা, পদক, ক্রেস্ট, কলম, বৃত্তি, বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ ইত্যাদি) এবং

২. অবস্তুগত পুরস্কার বা মানসিক পুরস্কার (যেমন, প্রশংসাসূচক বাক্য—খুব ভাল, চমৎকার, অসাধারণ, অভিনন্দন, ধন্যবাদ, সুন্দর, ভালো বলেছ বা করেছ, আরও ভালো করবে এসব বলা)।

বস্তুগত পুরস্কারের চেয়ে অবস্তুগত পুরস্কার শিক্ষার্থীদেরকে কোনোকিছু শিখতে বা পড়তে বেশি উদ্বুদ্ধ, আত্মসচেতন ও আন্তরিকভাবে আগ্রহী করে তোলে। তাই শিক্ষকদের উচিত শিক্ষার্থীদেরকে মানসিক পুরস্কার বেশি দেয়া। এছাড়া শিক্ষার্থীদের কাজে স্বাধীনতা, বারবার অনুশীলন করানো ও মুখস্থ না করিয়ে বুঝে পড়াতে পারলে তারা ভালো শেখে।

তবে বিশেষ প্রয়োজনে নিম্নলিখিত মনোবিজ্ঞানসম্মত শাস্তিগুলো শিক্ষকরা দিতে পারেন।

 মানসিক শাস্তি

১. চক্ষু শাসনের প্রবর্তন (রাগী চোখে তাকানো বা চোখে চোখে রাখা);

২. দৈহিক অঙ্গভঙ্গির শাসন (যেমন দুষ্টামি করলে রাগী চোখে তাকিয়ে শিক্ষার্থীর কাছে যাওয়া);

৩. কণ্ঠস্বরের শাসন (যেমন দোষ করলে রাগী গলায় কথা বলা, ভালো করলে মধুর স্বরে প্রশংসা করা);

৪. মনোভাবের পরিবর্তনগত শাসন (অন্যায় করলে শিক্ষার্থীকে বোঝানো যে তোমাকে যেমন ভাবতাম, তুমি তারচেয়ে দুষ্টু বা ভালো করলে প্রশংসাসূচক মনোভাব দেখানো );

৫. স্নেহপ্রাপ্তি বা পুরস্কারপ্রাপ্তি বঞ্চিতকরণ (যেমন শিক্ষার্থীকে বোঝানো যে, তুমি দুষ্টু তাই আমি তোমাকে আর ভালোবাসব না);

৬. সঙ্গী বা সহপাঠীর পুনর্বিন্যাসকরণ (অনেক সময় শিক্ষার্থীরা সহপাঠীর সহায়তায় দুষ্টামি করে বা খারাপ বন্ধুর সঙ্গের কারণে খারাপ হয়। তখন সঙ্গী পুনর্বিন্যাস করা জরুরি। কখনও দুর্বল শিক্ষার্থীকে ভালো শিক্ষার্থীর সাথে দলে কাজ করতে দিলে দুর্বল শিক্ষার্থী ভালো শেখে);

৭. পরীক্ষাভীতির প্রয়োগ (শিক্ষার্থীকে মনে করিয়ে দেয়া যে না পড়লে বা শিখলে পরীক্ষায় খারাপ করবে);

৮. ভর্ৎসনা করা ও নির্দেশনা প্রদান ইত্যাদি।

শারীরিক ও মানসিক শাস্তি

১. শ্রেণির কাজ বা বাড়ির কাজ বেশি প্রদান;

২. শ্রেণিকক্ষের অভ্যন্তরে স্বল্পসময় দাঁড় করিয়ে রাখা;

৩. টিফিনের সময় বা ছুটির পর কিছু সময় বিদ্যালয়ে আটকে রেখে কোনো পড়া করিয়ে নেওয়া ইত্যাদি।

তবে অবশ্যই মনে রাখা প্রয়োজন, শিক্ষার্থীকে প্রতিপক্ষ না ভেবে তার প্রতি সহমর্মিতা, সহনশীলতা ও সম্প্রীতিমূলক সম্পর্ক বজায় রেখে শিক্ষার্থীর পরিপূর্ণ বিকাশ সাধনের লক্ষ্যে তার পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও তার শারীরিক, মানসিক পরিপক্কতা সম্পর্কে সচেতন হয়ে নিতান্ত প্রয়োজনের তাগিদে ন্যূনতম শাস্তি দেয়া যেতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে শিক্ষককে নিচের নিয়মগুলো মেনে চলতে হবে: – শাস্তির প্রকৃতি শিক্ষার্থীর অপরাধের প্রেক্ষিতে নির্ধারণ করতে হবে। ছোটখাট অপরাধের জন্য সাবধানবাণী উচ্চারণ করলেই চলে;

 শাস্তি হবে পরিমিত, কারণ শিক্ষার্থী প্রতিপক্ষ নয়;

 শাস্তির বিধান হবে নমনীয়। কারণ শিক্ষার্থীরা চোর, ডাকাত বা সন্ত্রাসী শ্রেণিভুক্ত নয়;

 গুরুতর অপরাধের শাস্তি হবে দৃষ্টান্তমূলক যাতে তেমন অপরাধ আর কেউ না করে বা করতে ভয় পায়;

 জ্ঞানচর্চার বিশৃঙ্খলাকারীর শাস্তি হবে উন্মুক্ত বা সবার প্রত্যক্ষণযোগ্য, যাতে তা দেখে বাকি শিক্ষার্থীরা সাবধান হতে পারে;

 শিক্ষাঙ্গনে শাস্তির বিধান ক্রোধবর্জিত অবস্থায় প্রবর্তিত হবে যাতে শিক্ষক রাগের মাথায় শিক্ষার্থীকে অননুমোদিত শাস্তি দিয়ে না ফেলেন;

 শাস্তিদানের পর কখনও সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করা যাবে না। তার সাথে স্বাভাবিক আচরণ করতে হবে। কেননা তাকেই শাস্তিদানের দায়িত্ব দেয়া যায় যিনি আবার স্নেহের পরশে শিক্ষার্থীকে সিক্ত করেন;

 বিদ্যালয়ে বা যেকোনো শিক্ষাঙ্গনে শাস্তির উদ্দেশ্য হবে সংশোধনমূলক। শিক্ষার্থী কোনো ভুল করলে তা শুধরে দেওয়াই মূল বিবেচ্য।

 শিক্ষক মনস্তাত্ত্বিক ভাবধারায় শিক্ষার্থীদের মন জয় করবেন। প্রয়োজনে শাসন করবেন, শাস্তি দিবেন কিন্তু কখনোই সীমা লঙ্ঘন করবেন না;

 গবেষণায় প্রমাণিত শারীরিক শাস্তির চেয়ে মানসিক শাস্তি বেশি ফলপ্রসূ। তাই শারীরিক শাস্তিদানের চেয়ে মানসিক শাস্তিদানের প্রতি শিক্ষকের আগ্রহ বেশি থাকা উচিত;

 শুধু শাস্তি দিলেই হবে না, শিক্ষার্থীকে নির্দেশনা দিয়ে সংশোধনের সুযোগও দিতে হবে। শিক্ষার্থী সংশোধিত হলে মানসিক পুরস্কার ও দিতে হবে যাতে সে তার শাস্তির সুফল বুঝতে পারে।

গবেষণায় এটিও প্রমাণিত, শিক্ষার্থীর শিখনে শাস্তির চেয়ে পুরস্কার বেশি ফলপ্রসূ। তাই শাস্তির পরিবর্তে পুরস্কার দিয়ে শিক্ষার্থীদের শেখানো বা ত্রুটিপূর্ণ আচরণ সংশোধনের প্রতি শিক্ষকের আগ্রহ বেশি থাকা উচিত।

2 COMMENTS

  1. Thanks a lot for you nice initiative for education.
    I always try to read all of your post.
    For your kind info, One of my daughter read in K.G. She is very emotional. Can you provide me some list of books for herself, which will helpful for her mental development.

    Regards
    Anowar

  2. ছোটদের ছড়ার বই, জাপানি রূপকথার বই, ঠাকুরমার ঝুলি, ছোটদের সায়েন্স ফিকশন, কার্টুন, ছবির বই – এসব বই শিশুদের মানসিকতা ও সৃজনশীলতার বিকাশে খুবই সহায়ক। তবে শিশু কি পড়তে ভালবাসে, তা বিবেচনা করে বই নির্বাচন করা ভাল।

    ধন্যবাদ। ভাল থাকুন। আর আপনার মেয়ের জন্য শুভকামনা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here