বাংলাদেশের শিক্ষা - ছোট
বাংলাদেশের শিক্ষা - ছোট


ড. রাগিব হাসান: উপমহাদেশের দেশগুলোতে ঐতিহাসিক কারণে জটিল ভিক্টোরিয়ান ইংরেজির কদরটা খুব বেশি। কে কতো জটিল করে লিখতে পারে, তার ইংরেজির দখল ততো বেশি ধরা হয়। মনে আছে, স্কুলে সেই নোটকেই সেরা ধরা হতো, বেশি নম্বর দেয়া হতো, যেখানে জটিল সব শব্দ ব্যবহার করা হতো, আর প্রতিটি বাক্য হতো লম্বা, সুদীর্ঘ, তালগাছের চাইতেও বেশি, বটগাছ আকারের, পুরা এক প্যারা জুড়ে থাকতো সেইসব বাক্য।

বড় একটা ধাক্কা খেলাম নিজে পিএইচডি করতে এসে। শুরুতেই দেখলাম, অভ্যাসবশত আমি কথাও বলি ওই স্টাইলে। মানে প্রতিটা বাক্য বেশ লম্বা, একাধিক clause দেয়া, আর বাক্য শেষ করতে আধা মিনিট লাগে। ধাক্কাটা খেলাম, কারণ হঠাৎ আবিষ্কার করলাম, আমার বিদেশি ইংরেজিভাষী শ্রোতারা প্রায় সবাইই খেই হারিয়ে ফেলে, ভেঙে ভেঙে না বললে তারা বুঝতে পারে না কিছুই।

ব্যাপারটা তাহলে কী? আসলে আমি যেভাবে লম্বা লম্বা বাক্য লিখতে শিখেছিলাম, কথা বলার সময়েও সেভাবেই বলছিলাম, আর সেই তালগাছি বাক্যের চোটে শ্রোতারা হয়ে পড়ছিলো হতভম্ব। লেখার ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। আধুনিক ইংরেজিতে বিশেষ করে টেকনিকাল বিষয়ে লেখার ক্ষেত্রে দীর্ঘ বাক্য লেখাটা একেবারেই প্রথাবিরুদ্ধ। কারণ ছোট ছোট করে লেখা বাক্য পাঠকের পড়তে ও বুঝতে অনেক সুবিধা হয়।

এই কথাটা আবারও বলতে চাচ্ছি, কারণ মাস্টার্স বা পিএইচডি পর্যায়ে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের পার্সোনাল স্টেইটমেন্ট পড়তে গেলেই দীর্ঘ তালগাছি বাক্য কিংবা বিদঘুটে অপ্রচলিত শব্দের অত্যাচারের মুখে হয় পড়তে। ভর্তির অন্যান্য ডকুমেন্টের সাথে ১ বা ২ পাতার একটি স্টেইটমেন্টে লিখতে হয় আবেদনকারী কেনো উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা দুইটা বড় ভুল করে থাকে। প্রথমত, দীর্ঘ দীর্ঘ ভিক্টোরিয়ান স্টাইলে লেখা বাক্য লিখে ভরিয়ে ফেলে, যার মাঝামাঝি আসতে আসতে শুরুতে কী বলা হয়েছে, তার খেই হারিয়ে ফেলে পাঠক। একটা উদাহরণ দেই-

I currently work as a software engineer at a local software company where I am working on many new projects in which I have successfully applied my knowledge of new programming techniques and I should mention that this experience will be valuable when I get myself admitted in graduate school because I will be able to apply the same techniques in solving problems for my thesis.

এটা কাল্পনিক উদাহরণ (কারণ কারো SOP জনসমক্ষে প্রকাশ করবো না), তবে এরকম বড় বাক্য অনেকেই লিখে। পড়তে গেলে দেখবেন, আগা থেকে গোড়ার দিকে যেতে গেলে খেই হারিয়ে ফেলার দশা হয়।

অথচ এই বাক্যটাকেই খুব সহজে ভেঙে ফেলা যায় এভাবে-

I currently work as a software engineer at a local software company. Here, I am working on many new projects in which I have successfully applied my knowledge of new programming techniques. I should mention that this experience will be valuable when I get myself admitted in graduate school. That is because I will be able to apply the same techniques in solving problems for my thesis.

এবারে পড়ে দেখুন, উপরের বটগাছি বাক্যটিকে ৪টি বাক্যে ভাগ করে দেয়া হয়েছে। পড়তে ও বুঝতে অনেক সুবিধা, আর বিশেষ করে বিদেশি ইংরেজিভাষীদের জন্য এই বাক্যরীতিটাই সহজ, কারণ তারা ছোট ছোট বাক্য লিখে ও পড়ে অভ্যস্ত।

দ্বিতীয় যে ভুলটা করে, খুবই বিরক্তিকর ব্যাপার, সেটা হলো GRE পড়তে গিয়ে যেসব বিদঘুটে শব্দ শিখেছে, সেগুলা উগরে দেয়া। এটা আরেকটা খুবই কমন কাজ। ভাবখানা এমন যে, এই শব্দটি জানে তা দেখলে সবাই খুব চমৎকৃত হয়ে যাবে। কিন্তু ভেবে দেখুন, বাংলাতে যদি কেউ এসে আপনাকে বলে এরকম কিছু?

“হে বৎস, অদ্য তোমাদিগের বাটিতে গমন করিয়া দেখিলাম, একজন প্রোষিতভর্তৃকা দূরালাপনীতে কথোপকথন করছেন, আর গবাক্ষ এর মধ্য দিয়া বাহিরের বটবৃক্ষ আর পার্শ্বের ফল্গুধারা প্রবাহিত হইতে দেখিতেছি”?

এরকম বাক্যের শব্দগুলার মানে বের করতে হলে পাঠককে অভিধান নিয়ে বসতে হবে, আর মেজাজটাও যাবে খিচড়ে।

ইংরেজিতে এরকম বিদঘুটে প্রচুর শব্দ আছে, যার ব্যবহার কেবল GRE পরীক্ষাতেই হয়, বাস্তব জীবনে এগুলার কোনো ব্যবহার নাই বললেই চলে। একটা উদাহরণ দেই-

The obfuscation in area X and area y appear to be extreme, many people have considered it to be anathema and the areas really abut upon a single connecting objective pioneering tomorrow’s Internet.

(উদাহরণটা কাল্পনিক, কিন্তু বেশ কিছু স্টেইটমেন্টএ obfuscation, anathema, “abut upon” এরকম অপ্রচলিত “প্রোষিতভর্তৃকা” মার্কা ইংরেজি ব্যবহার হতে দেখেছি)।

বলাই বাহুল্য, এরকম দুর্বোধ্য শব্দ চোখে পড়লে পাঠকের মনে সমীহের বদলে রাগের উদ্রেক হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

কাজেই সহজে লিখুন, সাধাসিধা ভাবে, কারণ সাধাসিধা কথার জয় সর্বত্র, সহজ ভাষা দিয়েই বোঝাতে পারেন আপনার মনের কথা খুব কার্যকরভাবে। আর উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে তো এই কথাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ … আপনাকে তো ভর্তি কমিটির কেউ দেখবেনা, দেখবে আপনার লেখা শব্দগুলাকে। তালগাছি বাক্য, আর দুর্বোধ্য শব্দ দিয়ে কাউকে কখনোই মুগ্ধ করতে পারবেন না, বরং সহজ ভাষায় ছোট্ট ছোট্ট শব্দেই অনেক ভালো করে বলতে পারেন ভবিষ্যতের সব পরিকল্পনা, বুনতে পারেন আপনার স্বপ্নের কথা।

জয় হোক সহজ ভাষার।

ড. রাগিব হাসান: অ্যাসিস্টেন্ট প্রফেসর, ডিপার্টমেন্ট অফ কম্পিউটার অ্যান্ড ইনফরমেশন সায়েন্সেস, ইউনিভার্সিটি অফ আলাবামা অ্যাট বার্মিংহাম, বার্মিংহাম, আলাবামা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ওয়েব সাইট: www.ragibhasan.com

Previous articleমোবাইল লার্নিং: শিক্ষার নতুন প্রেক্ষাপট
পরবর্তী লেখাপরিবার থেকে শেখা: বাবা
গৌতম রায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে শিক্ষায় স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে শিক্ষা-গবেষক হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেন ব্র্যাকের গবেষণা ও মূল্যায়ন বিভাগে। পরবর্তীতে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-এ যোগ দেন গবেষণা ও মূল্যায়ন সমন্বয়ক হিসেবে। সেখান থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে শিক্ষকতা পেশায় আসেন। তিনি আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ও পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট উভয় পর্যায়ে শিক্ষা-গবেষণার সাথে সম্পর্কিত কোর্সসমূহ যেমন—শিক্ষায় গবেষণা পদ্ধতি, শিক্ষায় মূল্যায়ন ও পরিমাপ, শিক্ষায় কর্মসহায়ক গবেষণা, শিক্ষা গবেষণায় পরিসংখ্যান ইত্যাদি কোর্সসমূহ পড়াচ্ছেন। পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষা বিষয়ে বিভিন্ন গবেষণার সাথেও যুক্ত রয়েছেন। গবেষক হিসেবে তিনি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা, শিক্ষায় মূল্যায়ন পদ্ধতি, শিক্ষা ও আইসিটি, কমিউনিটির সম্পৃক্ততা, শিক্ষায় প্রবেশগম্যতা, শিক্ষা প্রকল্প মূল্যায়ন ইত্যাদি বিষয়ে ৩০টিরও বেশি গবেষণা প্রজেক্টের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শিক্ষা-বিষয়ে তাঁর একাধিক গবেষণাভিত্তিক প্রবন্ধ বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে এবং একাধিক বই প্রকাশিত হয়েছে। শিক্ষা-বিষয়ে নিয়মিত লিখছেন বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও অনলাইন মিডিয়ায়। তিনি ‘বাংলাদেশের শিক্ষা’ ওয়েবসাইটের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here